ভারতের অভিবাসী কর্মীদের সাথে বাংলাদেশি কর্মীদের পার্থক্য কোথায়

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৫, ১২:৩৭

২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারত, যেখানে আনুমানিক ১২৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাহিত হবে। এরপর মেক্সিকো (৬৮ বিলিয়ন ডলার), চীন (৪৮ বিলিয়ন ডলার), ফিলিপাইন (৪০ বিলিয়ন ডলার) এবং পাকিস্তান (৩৩ বিলিয়ন ডলার) রয়েছে।
২০২৪ সালে ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহ ১২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ভারতের তুলনায় অনেক কম। এই ব্যবধান কেন সৃষ্টি হয়েছে? কোন উপাদানগুলো ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহকে এত শক্তিশালী করেছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে?
ভারত ও বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য ভিন্ন হওয়ার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। ভারতের প্রধান রেমিট্যান্স উৎস দেশসমূহ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান রেমিট্যান্স উৎস দেশগুলোর মধ্যে আছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, মালয়েশিয়া, কাতার ইত্যাদি।
ভারতের রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ উন্নত দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা) থেকে আসে, যেখানে উচ্চ বেতনের পেশাজীবীরা (বিশেষ করে প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতের কর্মীরা) কাজ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে, যেখানে নিম্নদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকদের আধিপত্য বেশি। ফলে ভারতীয়দের গড় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।
ভারতের সরকার কয়েক দশক ধরে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা তাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ।
১. উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন
ভারতের IIT (Indian Institute of Technology), IIM (Indian Institute of Management) এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান করছে। দেশটির IT ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং খাত এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে ভারতীয়দের প্রভাবশালী অবস্থান রয়েছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সরকার প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিনিয়োগ করেছে।
২. "Skill India" ও অন্যান্য কর্মসংস্থান উন্নয়ন প্রকল্প
ভারতের "Skill India" কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ যুবককে AI, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ব্যাপকভাবে কাজ করছে, যা তাদের গ্লোবাল চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করেছে।
৩. বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ সুবিধা
ভারত সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাই-লেটারাল লেবার অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে, যা দক্ষ শ্রমিকদের জন্য উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশে ভারতীয় শ্রমিকদের ভিসা ও চাকরির সুযোগ বৃদ্ধির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন বিএমইটি (BMET), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, টিটিসি (Technical Training Centers) ইত্যাদি, তবে দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক গড়ে তোলার জন্য আরো বৃহৎ পরিসরে কাজ করা প্রয়োজন।
এই দক্ষ শ্রমিক তৈরি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী কর্মীদের আয়ের ক্ষেত্রে। ভারতের অভিবাসী কর্মীদের যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে গড় আয় ১৫০০-৩০০০ ডলার, সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গড় আয় ৪০০-৮০০ ডলার। পেশার ক্ষেত্রেও ভারতের দক্ষ কর্মীরা দখল করে আছে উচ্চ বেতনের পেশাগুলোতে; যেমন- প্রকৌশলী, ডাক্তার, গবেষক, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অন্যদিকে বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিকরা মূলত নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, কারখানার শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, ক্লিনার, মালি ইত্যাদি পেশায় নিয়োগ পায়।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করতে কী করা উচিত?
বাংলাদেশ যদি ভারতের মতো উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
দক্ষ শ্রমশক্তি গঠন: প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতে প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। IT, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অন্যান্য উচ্চ বেতনের পেশার জন্য বিশেষ স্কলারশিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।
উন্নত দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ: শুধু মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভর না করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশিদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির জন্য বাই-লেটারাল চুক্তি করা দরকার।
ভিসা ও অভিবাসন সুবিধা: মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে উচ্চ বেতনের দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ বাড়াতে হবে, যাতে বাংলাদেশিরা উন্নত দেশে পড়াশোনা করে সেখানে কর্মসংস্থান পেতে পারে।
মাইগ্রেশন প্রসেস সহজতর করা: বিদেশে চাকরি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে মধ্যস্থতাকারী দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো দরকার। স্বচ্ছ ও স্বল্প খরচে বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার মূল কারণ হলো দক্ষ শ্রমশক্তির আধিক্য, উচ্চ বেতনের দেশে কর্মসংস্থান এবং সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা। বাংলাদেশ যদি একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করে এবং দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন, এআই