
"আমি জানি না আমি বেঁচে ফিরতে পারব কিনা। দয়া করে আমাকে দেশে ফিরিয়ে নিন, নইলে আমি মারা যাব।"
এটাই
ছিল নাটোরের রহমত আলীর স্ত্রীকে বলা শেষ কথা, তারপর থেকেই তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ
করা সম্ভব হয়নি। রহমত আলী ও তার শ্যালক হুমায়ুন কবির ইউরোপে গিয়ে ভালো উপার্জনের
আশায় বাড়ির জমি বন্ধক, গয়না বিক্রি ও ঋণ নিয়ে স্থানীয় এক এজেন্টকে ১৮ লাখ টাকা
দেন। প্রতিমাসে আড়াই লাখ টাকা বেতনের প্রলোভনে তারা প্রথমে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া
হয় এবং পরে "বিক্রি" করে পাঠানো হয় রাশিয়ায়।
সেখানে
পৌঁছানোর পর, তাদের জোরপূর্বক ১৫ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে
পাঠানো হয়। দুর্ভাগ্যবশত, কবির চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি এক ড্রোন হামলায় নিহত হন।
যুদ্ধদাসত্বের
শিকার আরও বাংলাদেশি
একই
রকম প্রতারণার শিকার হন নরসিংদীর আকরাম হোসেন ও সোহান মিয়া। তাদের একজন রান্নার কাজে এবং
আরেকজন মালি হিসেবে কাজের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। চাকরির জন্য তারা প্রতিজন প্রায়
৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এজেন্টরা জানান, প্রথমে সৌদি আরবে ওমরাহ ভিসায় পাঠানো হবে,
পরে রাশিয়ার কর্মসংস্থানের অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তারা এক মাসের ভ্রমণ
পাস পান।
সেন্ট
পিটার্সবার্গের বিমানবন্দরে নামার পরপরই তাদের মোবাইল ফোন ও কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া
হয়। এরপর তাদের নির্যাতন, মারধর ও হুমকি দিয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা
হয়। আকরাম কোনোমতে দেশে ফিরতে সক্ষম হন, তবে সোহান এখনো যুদ্ধক্ষেত্রেই আটকে আছেন।
কেবল
তারাই নয়, কেরানীগঞ্জের আমিনুল ইসলাম, যশোরের জাফর হোসেন ও নরসিংদীর মোবারক হোসেনসহ
আরও অনেক বাংলাদেশি একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন।
১৮জন বাংলাদেশি প্রতারণার শিকার, কেউ নিহত, কেউ নিখোঁজ
একটি
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় প্রতারিত হয়ে
যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ নিখোঁজ রয়েছেন,
আবার কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছেন।
রাজবাড়ীর
আরমান মন্ডল এমনই একজন, যিনি একটি মাইন বিস্ফোরণে আহত হন। তাকে রাশিয়ার একটি সেনানিবাসে
বাগান পরিচর্যা বা রান্নার চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়েছিল এবং ১০ বছরের ওয়ার্ক পারমিটের
প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তাকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র এক মাসের পর্যটন
ভিসা এবং জোরপূর্বক যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, যারা ইউরোপ যেতে চেয়েছিলেন, তাদের রাশিয়ায় পাচার করা
হয়েছে। কেউ সরাসরি রাশিয়ায় যেতে ৭-৮ লাখ টাকা দিয়েছেন, আবার কেউ ইউরোপে পৌঁছানোর
আশায় ১৫-১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছেন।
"ড্রিম
হোম ট্রাভেলস" নামে এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রায়
সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, "ড্রিম হোম ট্রাভেলস" নামক একটি এজেন্সি এই প্রতারণার
মূল হোতা। ভুক্তভোগীদের আত্মীয়রা এজেন্সির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অফিসটি
বন্ধ পাওয়া গেছে।
প্রবাসীকল্যাণ
ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তদন্তে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটি কোনো বৈধ রিক্রুটিং
এজেন্সি নয়, বরং এটি একটি ভ্রমণ সংস্থা। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে এবং এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সতর্ক
থাকার নির্দেশনা জারি করেছে।
এদিকে,
মূল হোতাদের একজন, তামান্না জেরিন, গত ৬ ফেব্রুয়ারি নেপালে পালানোর চেষ্টা করার সময়
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন। তবে অন্য অভিযুক্তরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সরকারকে
জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
এই
নৃশংস প্রতারণার শিকার হওয়া মানুষ ও তাদের পরিবার শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম
ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের
কাছে আবেদন জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
দাবি করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ ধরনের বেআইনি ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর
ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় দালাল ও প্রতারকদের চিহ্নিত করাও জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে
আর কোনো বাংলাদেশিকে যুদ্ধদাস বানানোর ফাঁদে ফেলা না যায়।
তথ্যসূত্র:
দি ডেইলি স্টার – ২৮.০২.২০২৫