
বহু বছর ধরে স্বর্ণ সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর মূল্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই এটিকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। তবে স্বর্ণ কেনার জন্য ঋণ নেওয়া কি ভালো সিদ্ধান্ত?
ব্যক্তিগত ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে স্বর্ণ কিনতে হলে অবশ্যই সতর্কতার প্রয়োজন। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। এর ঝুঁকি ও বিকল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে আপনি সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
স্বর্ণের দাম বাড়ছে, তবে কি এটি ঋণ নিয়ে কেনার মতো যথেষ্ট মূল্যবান?
ইতিহাস দেখায়, স্বর্ণের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, যা এটিকে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ বানিয়েছে। এমনকি অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও স্বর্ণের চাহিদা থাকে, বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে। যারা নগদ অর্থের অভাবে আছেন, তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বর্ণ কেনার জন্য বিশেষ ঋণও দিয়ে থাকে।
কিন্তু এটি কি সত্যিই একটি চতুর বিনিয়োগ কৌশল?
১৮ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম সর্বকালের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে স্পট গোল্ড প্রতি আউন্স $৩,০৩৮.২৬-এ পৌঁছেছে। দুবাইতে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রায় ৩৬৫.২৫ দিরহাম প্রতি গ্রাম, আর ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রায় ৩৩৮.২৫ দিরহাম প্রতি গ্রাম।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
ইউএইভিত্তিক স্বর্ণ বিনিয়োগকারী থেকে বিশ্লেষক হয়ে ওঠা জর্জিনা এফেল মনে করেন, এই দামে ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। “স্বর্ণ এখন রেকর্ড উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, তাই ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ,” তিনি সতর্ক করে বলেন।স্বর্ণের দাম কমলেও এফেল ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনার বিপক্ষে মত দেন। “স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন দিতে পারে, কিন্তু উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিয়ে কেনাকে অনাকর্ষণীয় করে তোলে। বাজারের অস্থিরতা দ্রুত মুনাফা মুছে ফেলতে পারে। ফলে আপনি শুধু ঋণের বোঝায় পড়ে যাবেন।”
ক্রেডিট কার্ড বা ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনা কি উচিত?
অনেকেই ঝুঁকি সত্ত্বেও ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনার কথা ভাবেন। কিন্তু যদি করতেই হয়, তাহলে কোন উপায় সবচেয়ে ভালো হতে পারে?
• ব্যক্তিগত ঋণ: কম সুদের হারে ঋণ পাওয়া গেলে এটি তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে, বিশেষ করে যদি স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে সবাই কম সুদের ঋণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না এবং যদি স্বর্ণের দাম কমে যায়, তাহলে আপনি ঋণের বোঝায় পড়ে যেতে পারেন।
• ক্রেডিট কার্ড : এটি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার সাধারণত ১৪% থেকে ৩০% পর্যন্ত হতে পারে। ভারতীয় স্বর্ণ ঋণ বিশেষজ্ঞ শিনো থোমা বলেন, স্বল্প মেয়াদে স্বর্ণ কেনা অত্যন্ত অনিশ্চিত। “স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণ কেনা লাভজনক নাও হতে পারে। যদি দাম পড়ে যায়, তাহলে দ্রুত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।”
ধার করা অর্থ দিয়ে স্বর্ণ কেনা কি কখনোই ভালো ধারণা হতে পারে?
গত বছর স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেখলে, স্বর্ণের বার্ষিক রিটার্ন অনেক ক্ষেত্রেই ঋণের সুদের হারের চেয়ে কম হয়ে থাকে।
তাহলে কি ঋণ নিয়ে স্বর্ণ কেনা উচিত? এর উত্তর নির্ভর করে আপনার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা ও আর্থিক অবস্থার ওপর। যদি আপনি এমন একটি ঋণ পেতে পারে, যার সুদের হার স্বর্ণের প্রত্যাশিত রিটার্নের চেয়ে কম, তাহলে এটি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কেবল যদি আপনি সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত থাকেন।
সর্বশেষ পরামর্শ: বিনিয়োগ করুন বুদ্ধিমানের মতো
স্বর্ণ এখনো একটি ভালো সম্পদ, যা বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করতে সহায়তা করে। কিন্তু ধার করে স্বর্ণ কেনা একপ্রকার জুয়া খেলার মতো। এফেলের পরামর্শ? “নিজের অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করুন এবং স্বর্ণ কেনার জন্য দাম কমার অপেক্ষা করুন।”
স্বর্ণ বিগত দশকে ভালো রিটার্ন দিয়েছে, তবে বিনিয়োগ করতে হলে বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ঋণের চাপ নিয়ে নয়। যদি আপনি স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে অল্প পরিমাণে ধাপে ধাপে কিনুন, বাজারের গুজবে প্রভাবিত হবেন না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করুন, ধার করা অর্থ নয়।
স্বর্ণের দাম বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তনশীল। বিনিয়োগের আগে সর্বশেষ বাজার মূল্য যাচাই করুন।
সূত্র: গালফ নিউজ