
বিদেশে পড়াশোনা যে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। আর তা যদি হয় অল্প খরচে, তাহলে হয়তো আগ্রহী হতো অনেকে। মানসম্মত শিক্ষার সাথে উন্নত, স্বস্তির জীবন। তাহলে চটজলদি সব গুছিয়ে নিয়ে হয়তো পাড়ি জমাতে চাইবেন আপনিও। এশিয়া, ইউরোপের কিছু দেশে অল্প খরচে পড়ার এমন সুযোগ আছে। বেশ ভালো শতাংশ ছাড়ের পরও আর্থিক সংকুলান না হলে আছে স্কলারশিপের ব্যবস্থা। এতে টিউশন ফিসহ থাকা-খাওয়ার খরচ অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া যায়। চলুন জেনে নিই কোন সে দেশগুলো…
জার্মানি
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি এখনো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবার উপরে। দেশটির বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের টাকায় চলে। ফলে দেশটিতে ব্যাচেলর বা বেশির ভাগ মাস্টার্স কোর্সে তেমন কোনো ফি দিতে হয় না। কিছু মাস্টার্স প্রোগ্রামে টিউশন ফি থাকলেও তা অন্যান্য দেশের তুলনায় তেমন বেশি নয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খরচ বলতে আছে সেমিস্টার কন্ট্রিবিউশন ফি, যার সঙ্গে টিউশন ফির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই পাবলিক পরিবহন, ক্রীড়া, অনুষদ/বিভাগীয় ছাত্রসংগঠন এবং প্রশাসনিক ফি ব্যয়ভার বহন করে। এই ফি প্রতিষ্ঠান ভেদে পরিবর্তিত হয় এবং সাধারণত ১০০ থেকে ৩৫০ ইউরোর (১ ইউরো সমান বাংলাদেশি টাকা ১১৮ টাকা ৯১ পয়সা) মধ্যে থাকে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার খরচ সাধারণত প্রতি মাসে ৭২৫ ইউরোর মতো হয়ে থাকে।
নরওয়ে
নরওয়েতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় কোনো টিউশন ফি দিতে হয় না। সব খরচ বহন করে সরকার। তবে প্রতি সেমিস্টারে শুধু একটি শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ফি দিতে হবে, যা ৩০ থেকে ৬০ ইউরোর মধ্যে। পাবলিক পরিবহন, সাংস্কৃতিক ইভেন্ট, স্বাস্থ্যসেবাতে বিশেষ ছাড় পওয়া যায়। যার কারণে খরচের ভারে নুয়ে যেতে হয় না শিক্ষার্থীদের। নরওয়েতে জীবনযাত্রার জন্য প্রতি মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ইউরোর মতো ধরে নিতে হবে। বড় শহরগুলোয় স্বাভাবিকভাবেই খরচ অনেক বেশি। তবে ছোট শহরগুলোয় কমবেশি ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউরোর মধ্যেই থাকা-খাওয়া, চলাফেরার যাবতীয় খরচ হয়ে যায়।
ফ্রান্স
শিল্প আর সংস্কৃতির দেশ ফ্রান্সে রয়েছে বিশ্বসেরা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। কেবল পড়াশোনাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সমগ্র ইউরোপীয় বাজারে দেশটির রয়েছে বেজায় প্রভাব। অনার্স করার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা এখানে বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার আশা করতে পারেন। সুস্বাদু খাবার থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক, ফ্যাশন, শিল্প-সাহিত্য এবং জীবনধারা; জীবনের প্রায় সবকিছুর একটি আনন্দদায়ক মিশ্রণের নাম ফ্রান্স। এখানে লাইসেন্স (স্নাতক) স্তরে প্রতি বছর খরচ হতে পারে ২ হাজার ৭৭০ ইউরো। মাস্টার্স লেভেলে খরচ আছে বছরপ্রতি ৩ হাজার ৭৭০ ইউরো। দেশটির বড় নগরীগুলোর জীবনযাত্রার খরচে প্যারিস, নিস, লিয়ন এসব শহর বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই করলে মাসে ৬৫০ ইউরোর নিচেই দিন যাপন করা যাবে।
অস্ট্রিয়া
ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র অস্ট্রিয়া। এ দেশটিতেও পড়াশোনায় টিউশন ফি নাই। তবে নন-ইউ/ইইএ দেশগুলোর ছাত্রছাত্রীদের জন্য এখানকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি সেমিস্টারে ২০ ইউরো ছাড়াও টিউশন ফি বাবদ গড়ে ৭২৬ দশমিক ৭২ ইউরোর মতো খরচ হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অস্ট্রিয়ার অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফি মুক্ত শিক্ষা প্রদান করছে। এর মধ্যে আছে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়, ভিয়েনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইনসব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়, জোহানেস কেপলার ইউনিভার্সিটি লিঞ্জ, গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিওবেন বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এ দেশটিতে জীবনযাত্রার খরচ ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম। প্রতি মাসে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ইউরোর বাজেটে ভিয়েনা এবং সালজবার্গে আবাসন, খাবার, ভ্রমণ খরচ মিটে যাবে। অন্যান্য জনপ্রিয় স্টুডেন্ট লোকেশনের মধ্যে লিনজ বা গ্রাজে থেকে পড়লে ৯০০ থেকে ১ হাজার ইউরোর মধ্যে মাসিক জীবনযাত্রার খরচ হয়ে যায়।
পোল্যান্ড
ইউরোপের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ৪৫০টিরও বেশি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে পোল্যান্ডে। পোলিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি পরীক্ষা না থাকার কারণে এ দেশে পড়তে যেতে চান দুনিয়ার বহু দেশের ছাত্রছাত্রীরা। আন্ডারগ্র্যাজুয়েশনের জন্য সর্বসাকুল্যে প্রয়োজন হবে শুধু মাধ্যমিক শিক্ষার একটি প্রশংসাপত্র, একটি আর্থিক কার্যকারিতা প্রশংসাপত্র, ইংরেজি বা পোলিশ ভাষার দক্ষতা। প্রথম, দ্বিতীয় এবং দীর্ঘ-চক্র অধ্যয়নের জন্য টিউশন ফি ২ হাজার ৩৬৮ ইউরো। পোল্যান্ড বেশ স্থিতিশীল অর্থনীতির ইউরোপীয় দেশ।তাই বাইরের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার খরচ এখানে প্রতি মাসে ৩৫০ থেকে ৫৫০ ইউরোর মধ্যেই থাকে। তবে শহর বড় হলে বা নগরায়ণের অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই বাজেট কমবেশি হতে পারে।
গ্রিস
বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের দেশ গ্রিস নানা কারণে ঐহিত্যমন্ডিত। উন্নত শিক্ষার মাধ্যমে সে ধারা তারা আবার বজায় রাখতে শুরু করেছে। দেশজুড়ে প্রচুর গ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি ভাষায় অধ্যয়ন করে ডিগ্রি লাভের সুবিধা রেখেছে। ইইউ দেশ হিসেবে গ্রিস বোলোগনা প্রক্রিয়ার সদস্য, তাই এখানকার শিক্ষার্থীরা ইউরোপের যে কোনো বোলোগনা সদস্য দেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট স্থানান্তর করতে পারেন। নন-ইউ/ইইএ শিক্ষার্থীদের জন্য বেশির ভাগ ব্যাচেলর এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য প্রতি শিক্ষাবর্ষে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ইউরোর মতো অর্থ খরচ করতে হয়। গ্রিসের সাশ্রয়ী পরিবেশে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর বাজেট প্রতি মাসে ৪৫০ থেকে ৭৫০ ইউরো হয়ে থাকে।
হাঙ্গেরি
ইউরোপের হাঙ্গেরি মানেই বৈচিত্র্য ও বহুসংস্কৃতির মেলবন্ধন। পাশাপাশি এর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের বাইরের শিক্ষার্থীদের যেন ডাকছে উচ্চশিক্ষার হাতছানি দিয়ে। সরকারি হাঙ্গেরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিউশন ফির দিক থেকে অন্যান্য পশ্চিমা দেশের থেকে কম। একজন বিদেশি শিক্ষার্থীকে অধিকাংশ ডিগ্রির জন্য প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ইউরোর মতো খরচের প্রস্তুতি রাখতে হয়। আর বাড়ি ভাড়ার খরচ ৩৭৫ থেকে ৭০০ ইউরোর মধ্যে। তবে তা অবশ্যই শহরের ধরনের ওপর নির্ভর করে। আবাসন, খাবার, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে রাজধানী বুদাপেস্টে প্রতি মাসে ৬০০ ইউরো যথেষ্ট। আর ছোট শহরগুলোয় প্রতি মাসে ৬০০ ইউরোর নিচে জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিদেশে অনার্সে পড়ার জন্য আর্থিক সহায়তার মধ্যে আছে ফেডারেল অনুদান, ফেডারেল এবং ব্যক্তিগত ঋণ। এর বাইরে আছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত বৃত্তি, যেগুলো এই দেশগুলোয় জীবনযাত্রার খরচের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করতে পারে।