
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য যুক্তরাজ্য। তবে গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে গেছেন। এ বছর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে গেছেন মাত্র ৯ হাজার ২৭৫ জন, যেখানে ২০২২ সালে দেশটিতে পড়তে যান ১৫ হাজার ২৩৪ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসানীতি পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করে দেশটিতে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার হার কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত ‘ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে সামনে এ সংখ্যা আরো কমতে পারে।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের তথ্যমতে, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা নিতে গেছেন। ২০২২ সালে নেপাল ও পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যে পড়তে যান যথাক্রমে ৪ হাজার ৬৬৪ এবং ২৭ হাজার ৯০৩ শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নেপাল ও পাকিস্তান থেকে যথাক্রমে ৮ হাজার ৫২৮ ও ৩১ হাজার ৯৩। অথচ ভারত ও বাংলাদেশ থেকে এ হার হঠাৎ কমে যায়। ভারত থেকে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে পড়তে যান ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৫২ জন শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার ১১০ জনে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে থাকা অভিবাসীদের জন্য নতুন ভিসানীতি আনে দেশটির সরকার। ‘ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে’ সে বছর মে মাসে এ পরিবর্তনের কথা প্রথম ঘোষণা করা হয়, যা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। এ নীতির ফলে ২০২৪ সাল থেকে স্নাতকোত্তর গবেষণা ডিগ্রিতে পড়া বিদেশি শিক্ষার্থীরাই পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে নিতে পারবেন। সরকারের অনুদানের বৃত্তি পেয়ে কোর্স করা শিক্ষার্থী তার ওপর নির্ভরশীল সদস্যদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে যেতে পারবেন। এর বাইরে কোনো শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্যদের নেয়ার সুযোগ পাবেন না। নতুন নিয়মে নির্ভরশীল ভিসা থেকে কাজের ভিসা আবেদনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্ভরশীল ভিসায় থাকা একজন শিক্ষার্থী দক্ষ কর্মী হলে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করে কাজের ভিসার আবেদন করতে পারেন।
বাংলাদেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে যান তাদের অধিকাংশই সাধারণত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ফলে দেশটির সরকারের দেয়া ভিসানীতির শর্ত পূরণ কঠিন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ভাটা পড়ে। যার প্রভাব পড়ে স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনে।
বাংলাদেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে যুক্তরাজ্যের আলস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে এমএসসি ইন মার্কেটিং উইথ অ্যাডভান্স প্র্যাকটিস কোর্স শেষ করেন শোয়েব আহমেদ। নতুন শিক্ষার্থী ভিসানীতি আরোপের ঠিক আগ মুহূর্তেই দেশটিতে পরিবারসহ কর্মজীবন শুরু করছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিতে সরকারের নেয়া কঠোর সিদ্ধান্তগুলোর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তরাজ্য নিয়ে আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে বেশির ভাগ স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে আসেন প্রফেশনাল বা অ্যাডিশনাল মাস্টার্স করার জন্য। কিন্তু নতুন নীতিমালার আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে। পরিবার থেকে দূরে থাকায় অনেকে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না এবং মানসিকভাবে হতাশায় ভুগছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘একাডেমিক ফি, হেলথ সারচার্জ ও ডিপোজিট ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের পরিবর্তে অন্যান্য দেশকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন। এসব কারণেই গত বছর থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তথ্য প্রদান ও গাইডলাইন দেয়া কনসালট্যান্সি ফার্ম স্ট্যান্ডার্ড এডুকেয়ার গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের শিক্ষার্থী আসেন। কেউ শুধু পড়াশোনার জন্যই যান। পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরত আসেন বা অন্য কোনো দেশে যান। আরেক ধরনের শিক্ষার্থী রয়েছেন, যাদের মূল লক্ষ্য পড়াশোনা নয়, বরং পড়াশোনা শেষে দেশটিতে চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। নতুন স্টুডেন্ট ভিসানীতির ফলে যারা রিসার্চ কোর্স ছাড়া সাধারণ মাস্টার্স কোর্স করতে যুক্তরাজ্যে যান তারা পরিবারের সদস্য নিতে পারছেন না। এ কারণেই স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার আগ্রহ কমেছে।’
তথ্যসূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা