শুধু ট্রাম্প নন; গোটা ইউরোপই অভিবাসনবিরোধী যুদ্ধে নেমেছে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০২

মাসের পর মাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন দমন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) এবং অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) বহিষ্কারের ঘটনাগুলোকে মিডিয়ার সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে শৃঙ্খলিত অভিবাসীদের ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে এবং তাদের নাম প্রকাশ করে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন আইনি মর্যাদাপ্রাপ্ত বিদেশিদেরও বহিষ্কারের জন্য উদ্যোগী হয়েছে, যার মধ্যে শিক্ষাবিদরাও রয়েছেন। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ১১ মিলিয়ন মানুষকে বহিষ্কার করবেন, যা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কালের দ্বিগুণ এবং বারাক ওবামার দুই মেয়াদের তুলনায়ও বেশি।
যখন বিশ্ব ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী প্রচেষ্টার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নীরবে কিন্তু সমান নিষ্ঠুরভাবে নিজের অভিবাসন দমন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর অভিবাসন নীতি
২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে ইইউ রাষ্ট্রগুলো ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৮০ জনের বিরুদ্ধে বহিষ্কার আদেশ জারি করেছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৭ হাজার ৭৪০ জনকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাস হওয়া এবং ২০২৪ সালের জুনে কার্যকর হওয়া নতুন "অভিবাসন ও আশ্রয় প্যাক্ট" বাস্তবায়নের ফলে বহিষ্কারের হার আরো বেড়েছে।
এই নতুন আইন অনুসারে ইউরোপীয় দেশগুলো দ্রুত অভিবাসীদের বহিষ্কার, আটক কেন্দ্রের সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় দেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে। তবে শুধু ইইউ সদস্য দেশগুলোই নয়, ইইউতে যোগদানের অপেক্ষায় থাকা বলকান দেশগুলোও এই চাপে রয়েছে। ইইউতে যোগদানের শর্ত হিসেবে এই দেশগুলোকে কঠোর অভিবাসন নীতি কার্যকর করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ইইউর সীমান্ত শক্তিশালীকরণ ও বহিষ্কার কেন্দ্র
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিষ্কার নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো "রিটার্ন হাব" তৈরি করা, যেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত অভিবাসীদের আটক রাখা হয়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের উদ্যোগে এই মডেল ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। অভিবাসীদের বলকান অঞ্চল, তুরস্ক এবং উত্তর আফ্রিকায় পাঠানো হচ্ছে।
ক্রোয়েশিয়া, যা বসনিয়া ও সার্বিয়ার সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে, ইইউর অভিবাসন দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্রোয়েশিয়া অবৈধভাবে অভিবাসীদের সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার (পুশব্যাক) ঘটনাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে, যা বহু মৃত্যুর কারণ হয়েছে এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই নীতি সত্ত্বেও ইইউ ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়াকে শেনজেন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে পুরস্কৃত করেছে।
অভিবাসন প্রত্যাখ্যানের নতুন কৌশল
ইইউ এখন রিডমিশন চুক্তি শক্তিশালী করছে, যা দেশগুলোকে অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে বা তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানোর অনুমতি দেয়। ফলে বলকান অঞ্চল কার্যত ইইউর "আবর্জনা ফেলার স্থান" হয়ে উঠেছে।
ক্রোয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাভোর বোঝিনোভিচ জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়ান সীমান্ত পুলিশ ৭১ হাজার "অবৈধ প্রবেশ" প্রতিহত করেছে। বসনিয়ার পররাষ্ট্র কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ক্রোয়েশিয়া ৪ হাজার ২৬৫ জনকে বসনিয়ায় ফিরিয়ে দিয়েছে এবং বসনিয়া ইইউর আর্থিক সহায়তায় ৮৯৩ জনকে তাদের নিজ দেশে পাঠিয়েছে।
অমানবিক অবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
ক্রোয়েশিয়ায় চারটি বড় অভিবাসন আটক কেন্দ্র রয়েছে- জেজেভো, তোভারনিক, দুঙ্গি ডল ও ত্রিলজ। এসব কেন্দ্রে অমানবিক পরিস্থিতি, অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক এবং নারী ও শিশুদের পুরুষদের সঙ্গে একই জায়গায় আটকে রাখার মতো ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
শুধু তাই নয়, ক্রোয়েশিয়ান পুলিশ স্লোভেনিয়া ও ইতালির পুলিশের সঙ্গে যৌথ টহল কার্যক্রম শুরু করেছে। ইইউর সীমান্ত প্রযুক্তি ব্যবস্থাও আরো শক্তিশালী করা হয়েছে, যার মধ্যে নজরদারি ক্যামেরা ও উচ্চ প্রযুক্তির পুলিশ গাড়ি অন্তর্ভুক্ত।
ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দোষারোপ করে সামরিকীকৃত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউর নজরদারি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বিকাশে সহযোগিতা এই নীতির অংশ। ফিলিস্তিনে পরীক্ষিত নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন, বায়োমেট্রিক ডাটাবেস এবং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক পুলিশিং এখন ইউরোপীয় সীমান্তে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যদি আমরা এই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা আরো সম্প্রসারিত হবে এবং আরো বেশি মানুষকে এর শিকার হতে হবে। একমাত্র উপায় হলো, আন্তঃদেশীয় সংহতি গড়ে তোলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা। নতুবা ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত ও ভয়াবহ হতে পারে।
লেখক: নিদজারা আহমেতাশেভিচ এবং ইমিনা বুঝিনকিচের কলাম
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা নিউজ