
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রপ্তানিতে শুল্ক আরোপ আমেরিকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন কারণেই যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করে থাকে, যার মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
১. দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া
যখন আমেরিকা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক বাড়ায়, তখন বিদেশি কোম্পানির জন্য সেই পণ্য আমেরিকায় বিক্রি করা ব্যয়বহুল হয়ে যায়। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় সুবিধা পায় এবং তাদের বাজার ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
২. বাণিজ্য ঘাটতি কমানো
যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকে (যেমন চীনের সাথে), তাহলে সেই দেশের রপ্তানিতে শুল্ক বসিয়ে আমদানি কমানোর চেষ্টা করে। এতে আমেরিকার ভোক্তারা দেশীয় পণ্য কেনায় উৎসাহী হয়, ফলে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা হয়।
৩. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি
কখনো কখনো শুল্ক আরোপ কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, আমেরিকা চীনের ওপর শুল্ক বসিয়ে চাপে রাখতে চায়।
আর যুক্তরাষ্ট্র যখন শুল্ক আরোপ করে, তখন এর প্রভাব শুধু দেশীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। নিচে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো—
১. বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধীরগতি
যুক্তরাষ্ট্র বড় অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ায় তার শুল্ক নীতির ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিতে পারে। আমেরিকা যখন শুল্ক বাড়ায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পাল্টা শুল্ক বসাতে পারে, যা বাণিজ্য যুদ্ধের সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮-১৯ সালে চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়।
২. পণ্যের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি
যখন আমেরিকা চীনের মতো কোনো বড় সরবরাহকারীর ওপর শুল্ক আরোপ করে, তখন বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কারণ, অনেক দেশই সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশেষ করে প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও খাদ্যশিল্পে এর প্রভাব বেশি পড়ে।
৩. বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা
শুল্ক নীতি বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। যদি কোনো দেশ আমেরিকার বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারায়, তাহলে সেখানকার কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ কমে যায়। এ কারণে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
৪. সরবরাহ চেইনের পুনর্বিন্যাস
যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারে। যেমন, আমেরিকা যদি চীনা পণ্যে উচ্চ শুল্ক বসায়, তাহলে অনেক কোম্পানি ভিয়েতনাম, মেক্সিকো বা ভারত থেকে আমদানি করতে শুরু করতে পারে।
৫. উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশ (যেমন বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম) আমেরিকায় প্রচুর পণ্য রপ্তানি করে। আমেরিকা যদি এই দেশগুলোর ওপর শুল্ক বাড়ায়, তাহলে তাদের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৬. ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
শুল্ক আরোপ শুধু অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি রাজনৈতিক এবং কৌশলগত বিষয়েও পরিণত হতে পারে। আমেরিকা যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ওপর শুল্ক বসায়, তাহলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি শুধু দেশীয় বাজারের জন্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে পারে, তবে অতিরিক্ত শুল্ক বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মাইগ্রেশন কনসার্ন রিপোর্ট।