Logo
×

Follow Us

মতামত

শরিফুল হাসানের অভিমত - প্রথম পর্ব

এক কোটি প্রবাসীর জন্য আমরা আসলে কী করছি?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৭:১৭

এক কোটি প্রবাসীর জন্য আমরা আসলে কী করছি?
শরিফুল হাসান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এর একজন সহযোগী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানটির মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন। পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সাথে খোলামেলা আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিমত। আজ থাকছে তার প্রথম পর্ব।

আমাদের এক কোটিরও বেশী কর্মী বিদেশে কাজ করে। প্রতি ঘন্টায় প্রায় দেড়শো জন বাংলাদেশী বিদেশে যায়। বাংলাদেশ হচ্ছে, বিশ্বের যে দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায়, সেই তালিকায় ষষ্ঠ। আর সবচেয়ে বেশী প্রবাসীর আয়ের তালিকায় সপ্তম। খুব স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক অভিবাসনে বাংলাদেশ শীর্ষ দশের মধ্যে আছে। 

কিন্তু আমাদের অভিবাসন খাতে মোটা দাগে কিছু সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, আমাদের বৈধভাবে বিদেশ যাবার জন্য যে রিক্রুটিং এজেন্সীগুলো বা এয়ারলাইন্সগুলো- আপনি দেখবেন সব রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস পল্টন, মতিঝিল, গুলশান, বনানী। এখন টাঙ্গাইলের যে মানুষটা বা কুমিল্লার যে মানুষটা বিদেশ যেতে চায়, তার সাথে এই সমস্ত এজেন্সির সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক মধ্যসত্ত্বভোগী বা দালাল শ্রেণী রয়ে গেছে। এরফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাবার খরচ গোটা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী, পক্ষান্তরে তার আয় গোটা পৃথিবীতে সবচেয়ে কম। এই যে আমরা বলছি এক কোটির বেশী লোক দেশের বাইরে আছে, তারমধ্যে কিন্তু সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যে।

মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহারাইন, কুয়েত, কাতার– এই ছয়টি দেশে; আর এর বাইরে আমাদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে  কর্মী যায় বেশী। 

আপনি কাগজে কলমে দেখবেন, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বলছে, আমরা প্রায় দুইশোর বেশী দেশে লোক পাঠাই, আমাদের শ্রমবাজার অনেক বৈচিত্র্যময়, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই আট থেকে দশটা দেশের মধ্যেই আমাদের শ্রমবাজার সুনির্দিষ্ট। তার ফলে, একই বাজারে যখন অনেক লোক যায়, তার বেতন, সুরক্ষার বিষয়গুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে খুব ভালো, তা নয়। 

এজন্য যাবার খরচ সবচেয়ে বেশী, মানুষ যেকোন মূল্যে যেতে চায়। কালকেই সে ৭-৮ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু ৭-৮ হাজার খরচ করে যে প্রশিক্ষণ– সেটা আবার নেবেনা। আবার জাতিগতভাবে আমরা সবাইকে সনদ দেবার কাজে যতখানি ব্যস্ত, সে তুলনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মীদের দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে সেই আগ্রহটা নেই। আবার এই যে বলছি আমরা অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বে ষষ্ঠ– আমাদের পাঠ্যক্রম, শিক্ষা ব্যবস্থায় কিন্তু সেটার কোন ছাপ নেই। 

আমাদের বিকল্প যে শ্রমবাজার, যেমন: জাপান, ইউরোপ- তারা যে নানান সেক্টরে লোক চাইছে, আপনি যদি কেয়ার গিভার হতে চান, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট হতে চান, সেই জায়গায় দক্ষতা কিন্তু আমরা সৃষ্টি করতে পারছিনা। সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমাদের শ্রমবাজার হলো অদক্ষ কর্মী পাঠানোর শ্রমবাজার। যে কাজগুলোকে আমরা বলি থ্রি ডি– ডার্টি, ডেঞ্জারাস, ডিফিকাল্ট, সেই সবচেয়ে কঠিন, বিপদজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই আমাদের লোকেরা যেতে চায়, সবচেয়ে বেশী টাকা খরচ করে যায়, সবচেয়ে কম বেতন পায়। সেখানে সুরক্ষার কোন বালাই নেই, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৫০-৫৫ ডিগ্রি গরম – সেই গরমে কাজ করা কিন্তু বাংলাদেশীদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। 

সমস্ত কিছু মিলে, ইতিবাচক ভাবে বলতে গেলে, গতবছর আমাদের প্রবাসীরা ২৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে। সাতাশ বিলিয়ন ডলার মানে সারা পৃথিবী বাংলাদেশকে যে ঋণ দেয় তার দশগুন বেশী! বাংলাদেশের মোট যত বৈদেশিক বিনিয়োগ তার ৮-১২ গুন বেশী!  তারমানে এই যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিটা আজ আমরা দেখি, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীন হয়েছি, তখন বাংলাদেশ ছিলো বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্র দেশ। সেই জায়গা থেকে আজ যে বাংলাদেশ বের হয়ে আসলো, তার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃষক ও গার্মেন্ট শ্রমিকের পর আমাদের প্রবাসীরা। তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে কী করেছি এই প্রবাসী কর্মীদের জন্য?

চলবে ...

Logo