বিশেষ সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব) - ড. তাসনীম সিদ্দিকী
সিন্ডিকেশন বন্ধ না করতে পারলে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর কী প্রয়োজন?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৫, ১২:৩০

ড. তাসনিম সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর মূল গবেষণা আন্তর্জাতিক অভিবাসন নিয়ে। ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট- রামরু'র তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার। অন্তর্বর্তী সরকারের ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য তিনি। অভিবাসন সমস্যা ও শ্রমবাজার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন ড. সিদ্দিকী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শোভন আরেফ।
শোভন আরেফ: ড. তাসনিম সিদ্দিকী, আপনাকে ধন্যবাদ মাইগ্রেশন কনসার্নের সাথে একান্ত আলাপে সময় দেবার জন্য। শ্রমবাজার হিসেবে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের অভিবাসন ইস্যু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দুই দেশের মধ্যে যে ‘সিন্ডিকেট’ ছিল, সেটির কতটা প্রভাব পড়েছে এই সেক্টরে?
ড. তাসনিম সিদ্দিকী: আপনাকে স্বাগত। মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশ থেকে যারা যাচ্ছেন, তারা যে চুক্তির অধীনে গেলেন সেখানে একটা সিন্ডিকেশন রয়েছে। প্রথমে ছিল ১০ জনের, তারপর ২৫ এবং পরবর্তীতে ১০১জন বা কোম্পানি নিয়ে একটা সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছিল। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেসব লোক সেখানে গিয়েছে, দেখা গেছে একেক জনকে সাড়ে ৫ লক্ষ টাকা করে দিতে হয়েছে। কেন? এখানে অভিবাসনের খরচ তো আছেই- প্লেনের টিকিট ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু এই সিন্ডিকেটের যারা সদস্য, তারা অন্য রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে বাড়তি ১লাখ টাকা নিয়েছে। মানে এই ১০১টির বাইরে যেসব এজেন্সি, তারা এদের মাধ্যমে লোক পাঠাতে এই অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে অভিবাসী ব্যক্তির কাছ থেকে। এই এক্সট্রা টাকা নেবার জন্যেই কিন্তু সিন্ডিকেশন।
শোভন আরেফ: এই সিন্ডিকেশনের মধ্যে মূলত কারা ছিল? এই চক্রের শক্তির উৎস কোনটি?
ড. তাসনিম সিদ্দিকী: এই সিন্ডিকেশনের জন্যে আমাদের দেশের অব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে- সরকার, মানে নীতি নির্ধারক, আমলাতন্ত্র এবং একই সাথে প্রাইভেট সেক্টর। এই তিনটির এক সাথে অবৈধ যোগসাজশ হয়েছে- এর ভিত্তিতেই এরকম একটা অব্যবস্থাপনা চলছে।
আমরা যাদের বলছি পলিসি মেকার; অর্থাৎ এই সিন্ডিকেটের মধ্যে বিগত সরকারের ৪জন ছিলেন সংসদ সদস্য। এই ধরুন অমুক লীগ, তমুক লীগ, পৌরসভা পর্যায় থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার- এরা সবাই ছিলেন এই সিন্ডিকেটের সদস্য। মানে রাজনীতির সাথে প্রাইভেট সেক্টরের একটা জোটের কারণে এটিকে আটকানো যায়নি। আর এরসাথে ছিল আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি। এর ফলেই এ ব্যাপারটা হয়েছে। এখন আমরা আবারো শুনতে পাচ্ছি যে, মালয়েশিয়াতে সিন্ডিকেশন ছাড়া লোক পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বা হবে না। এক্ষেত্রে আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি যে, এই সিন্ডিকেশন থাকলে আমাদের তাহলে মালয়েশিয়াতে লোক পাঠানোর প্রয়োজন নেই। এই সিন্ডিকেশনকে বন্ধ করতে হবে এবং বলতে হবে যে অন্য ১৪টি দেশ থেকে মালয়েশিয়া যেভাবে লোক নেয়, আমাদের এখান থেকেও সেই ভাবে নিতে হবে। যদি না নেয় তো যাবে না মালয়েশিয়ায়।
শোভন আরেফ: এতোটা শক্তিশালী ছিল যে সিন্ডিকেট, ভবিষ্যতে সেটি নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করা কতটা চ্যালেঞ্জের?
ড. তাসনিম সিদ্দিকী: মালয়েশিয়ায় দাতো আমিন আর আমাদের এখানে রুহুল আমিন- এই দুইজনের আগ্রহেই তো এই সিন্ডিকেশন শুরু হয়েছে। এই চক্রের পলাতক হোতাদের তো বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার কাছে ফেরত চেয়ে পাঠিয়েছে। এরপরও সেই সিন্ডিকেশন কিভাবে চলে যদি সরকার শক্ত হন? তাহলেই তো সিন্ডিকেশন বন্ধ হয়। এরজন্যে যদি লোক না পাঠাতে হয় তো একবছর লোক আমরা পাঠাবো না।
আমাদের দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি মালয়েশিয়ানদের টাকা খাইয়ে এমন অভ্যস্ত করে ফেলেছে যে তারাই এখন অন্য দেশ থেকে এক নিয়মে লোক নেয়, আর বাংলাদেশ থেকে তারা বলছে যে এই সিন্ডিকেশন ছাড়া লোক নেবে না। এখন এই বিষয়টি বন্ধ করতেই হবে। কেননা আমরা দেখেছি যে দুই বিলিয়ন ডলার বা ২০০ কোটি ডলার বিগত ৩ বছরে এই সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে আমাদের শ্রমিকদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সুতরাং এটা বন্ধ করতেই হবে, তা না হলে আর এই অন্তর্বর্তী সরকার কেন? আর এটা বন্ধ করা সম্ভব। এদের কাছে আর আত্মসমর্পন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
শোভন আরেফ: বাজারসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিগত সময়ের সিন্ডিকেশন এখনো রয়ে গেছে- এমনটাই অনেকের ধারনা। সেসব সিন্ডিকেটের কাছে এখনো প্রশাসনের অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। সুতরাং, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের এই সিন্ডিকেশন পরে রাজনৈতিক সরকার এলে যে আবারো হবে না- তার কি ভরসা?
ড. তাসনিম সিদ্দিকী: হ্যাঁ, রাজনৈতিক সরকার পরবর্তীতে ক্ষমতায় এলে এবং তাদের সাথে আবারো সেই অসাধু চক্রের স্বার্থ মিলে গেলে, আবারো এমনটি হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু, সেটিকে কী করে চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়, আমাদের এখন তাই ভাবতে হবে। ভরসার কথা হলো মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কিন্তু সিন্ডিকেশনে যাবার কোনো ইচ্ছা নেই। আর সেকারণেই তিনি বারবার বলছেন যে প্রক্রিয়াটি কিভাবে সিন্ডিকেশন ছাড়া চালু করা যায়। তাহলে, সে ধরনের একটা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এখনই করে ফেলা দরকার। যদি আগামী পাঁচ বছর এরকম একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়াতে আমরা শ্রমিক পাঠাতে পারি, তাহলে অন্তত পাঁচ বছরের জন্যে তো আমরা এই সিন্ডিকেট বন্ধ করতে পারবো।
শোভন আরেফ: ড. সিদ্দিকী, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। নিশ্চই আপনার সাথে অভিবাসন সংক্রান্ত আরো নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হবে।
চলবে ...