শরিফুল হাসানের অভিমত - দ্বিতীয় পর্ব
এক সৌদি আরবে আর কত লোক যাবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৫, ১০:৩০

শরিফুল হাসান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এর একজন সহযোগী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানটির মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন। পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সাথে খোলামেলা আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিমত। আজ থাকছে তার দ্বিতীয় পর্ব।
আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার সৌদি আরবে। সবচেয়ে বেশী কর্মী আছে আমাদের সৌদি আরবে– ৩০/৩৫ লাখ কর্মী সেখানে থাকে। কিন্তু এই বাজার থেকে রেমিট্যান্স আসার হার কিন্তু প্রথম বা দ্বিতীয় কোনটাতেই নেই। শুধুমাত্র গত চার বছরে বিশ লাখের মতো কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। তার আগে ধরেন আরো ১০-১৫ লাখ ছিলো।অথচ সৌদি আরব থেকে আমাদের প্রবাসী আয় চার বছর আগে ছিলো ৫.৭ বিলিয়ন ডলার। নতুন ২০ লাখ কর্মী যাবার ফলে এই আয় দ্বিগুন হবার কথা, অথচ কি হলো? বর্তমানে সৌদি আরব থেকে আমাদের রেমিট্যান্স কমে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। নতুন ২০ লাখ কর্মী গেলো আর প্রবাসী আয় কমলো ২ বিলিয়ন কমে গেলো। তাহলে লাভ কি হলো?
আমি বিদেশে কর্মী
পাঠাই যেন আমার দেশে ডলার আসে, রিজার্ভ বাড়ে। এখন কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে হুন্ডিতে টাকা
আসে। আসলে কিন্তু হুন্ডিতে টাকা আসেনা। হুন্ডিতে ওই দেশের টাকা সে দেশেই থেকে যায়।
বরং হুন্ডির ফলে অপরাধ, দূর্নীতি, লুটপাট, পাচার – এসমস্ত খাতে
অপব্যবহৃত হয়। তারমানে সৌদি আরবের বাজারের প্রতি আমাদের যে নির্ভরশীলতা – তাতে কিন্তু
আমাদের কোন উপকার হচ্ছে না। বরং আজ থেকে দশ পনের বছর আগে সৌদি আরব যেতে যে খরচ হতো
এখন সেটা তিন চারগুন বেড়েছে, বিপরীতে প্রবাসীর গড় আয় কমেছে।
গত তের বছর ধরে
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ আছে, ওমানে বন্ধ আছে। কাতার বিশ্বকাপের
পর আর লোক নিচ্ছে না, বাহারাইনে বন্ধ আছে। তার মানে এক সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে আমরা এত
লোক পাঠাচ্ছি, তাতে কর্মীদের আয়, কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কাজের সংকট তৈরী
হচ্ছে, প্রতারণা বাড়ছে, ফেরত আসার সংখ্যা বাড়ছে – এসব কিছু বিবেচনায়
সৌদি আরবের বাজার আমাদের জন্য ইতিবাচক নয়।
মালয়েশিয়ায় ১৯৯১
সাল থেকে বৈধভাবে কর্মী যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু বিগত ৪৫ বছর ধরে বেশীরভাগ সময়ই কর্মী
পাঠানো বন্ধ ছিলো। প্রতি চার-পাঁচ বছর পর পর মালয়েশিয়া নতুন নতুন নিয়ম করে। আগের নিয়মে
ত্রুটি ছিলো, অনিয়ম ছিলো, সিন্ডিকেট ছিলো – এমন অভিযোগ তুলে
নতুন নতুন নিয়ম করলো। এখন এই নতুন নিয়মের বেড়াজালে
আমাদের কর্মীরা আরো বেশী প্রতারিত হয়। এভাবেই মালয়েশিয়ায় বছরের পর বছর চলছে। গত বছর
যে পরিমান কর্মী যাবার কথা ছিলো, তারমধ্যে ১৮ হাজার কর্মী যেতে পারেনি, আবার যারা গিয়েছে,
তাদের অনেকে কাজ পায়নি। গত এক বছর ধরে বাজার বন্ধ। এই আঠারো হাজার কর্মী এখানে সেখানে
ঘুরছে, তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেনা, যাবার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
এই সার্বিক আলোচনায়
আমরা দেখি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চালানো আমাদের এক গবেষণায় দেখা যায়, এই বিপুল
অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মীদের এক তৃতীয়াংশই সফল হয়না। সে যে উদ্দেশ্যে যায়, একটি নিশ্চিত
ভবিষ্যত, একটি নিশ্চিত আয় – এসব ব্যর্থ হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এই
এক তৃতীয়াংশ তো আর্থিকভাবে লাভবান তো হয়ই না বরং আরো দৈণ্যের মধ্যে পড়ে যায়।
এর পাশাপাশি দেখা
যায়, আমাদের দেশের মানুষ যেভাবে দেশ ছাড়তে মরিয়া, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের
অনৈতিক পথে অনুপ্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশীরা প্রথম। এই তালিকায় আরো যারা আছে, আফগানিস্তান,
সিরিয়া, তিউনেশিয়া – যে দেশগুলোতে যুদ্ধ চলছে, যারা জীবন বাঁচাতে
ইউরোপে পালাচ্ছে, তাদের থেকেও বেপরোয়া বাংলাদেশীরা সে তালিকায় প্রথম। তারমানে আমাদের
কিন্তু ভয়াবহ পরিস্থিতি।
চলবে ...