শরিফুল হাসানের অভিমত - তৃতীয় পর্ব
কারা বিদেশ যাবে, কেন বিদেশ যাবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৫, ১৫:০২

শরিফুল হাসান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এর একজন সহযোগী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানটির মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন। পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সাথে খোলামেলা আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিমত। আজ থাকছে তার তৃতীয় পর্ব।
গত ১৫-২০ বছরে এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের ঢাকা শহরে ভালো চাকরী, বেতন সব কিছু ছিলো তারা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় পিআর নিয়ে চলে গেছে। সদ্য পাশ করা শিক্ষার্থীরা ভাবে আমি মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে চলে যাবো। আর একদম কম লেখাপড়া করেছে এমন লোকরা ভাবে আমি সৌদি আরব বা মালয়েশিয়া চলে যাবো। তার মানে সবাই যে ভাবছে, যে দেশে তার জন্ম, সে দেশ ছেড়ে চলে গেলেই ভালো থাকবে – এটা কিন্তু সবসময় খুব ইতিবাচক না। এটা যে শুধু অর্থনৈতিক কারণ তাও না।
আসলে আমাদের দেশে সুশাসনের একটা বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আমরা এমন একটি দেশ চেয়েছি, যে দেশটি নিরাপদ, সুশাসন বিরাজমান, মত প্রকাশের স্বাধীনতার আছে, ক্রস ফায়ার হবেনা, লুটপাট হবেনা। কিন্তু এই দেশে এসবের একটা বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। শুধু অদক্ষ কর্মী পাঠিয়েই আমাদের অর্থনীতি খুব ভালো হয়ে যাবে, বছরের পর বছর ভালো থাকা যাবে – তা কিন্তু না।
বিপরীতে চিত্রে আমরা দেখি, আমাদের কৃষিক্ষেত্রে কৃষি শ্রমিকের তীব্র অভাব। কিছু বিশেষ জেলার বেশীরভাগ তরুণ দেশের বাইরে। তাতে, আমাদের কৃষির উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেকখানি। ফলে আমাদের একটা বড় তরুণ শক্তি দেশের বাইরে থাকার এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের অর্থনীতিতে। ফলে, সার্বিকভাবে অভিবাসনসহ সব ক্ষেত্রে সামগ্রিক সুশাসন ব্যবস্থার অভাব খুবই প্রকট।
দক্ষ কর্মী বিদেশ পাঠানোর অর্থনৈতিক মূল্য সম্পর্কের আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। অদক্ষ ১৩লাখ কর্মী বিদেশ পাঠানোর চেয়ে দক্ষ এক লাখ কর্মী বিদেশ পাঠান। এই মুহুর্তে জাপান আমাদের কাছে কেয়ার গিভার নিতে চাইছে। জাপান বলছে যে, শুধুমাত্র জাপানের ভাষা এন ফোর লেভেল জানা থাকলেই তারা প্রশিক্ষিত কেয়ার গিভারদের নেবে। তাদের পরীক্ষায় পাশ করলে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা বেতনে জাপানে কর্মী পাঠানো যাবে। অথচ দু:খজনক হলেও সত্য যে বিগত দশ বছরে আমরা মাত্র দুই তিনশো লোক জাপানে পাঠাতে পেরেছি। অথচ ফিলিপাইন, নেপাল তারা কিন্তু হাজার হাজার কর্মী পাঠাচ্ছে।
তার মানে দক্ষ যে বাজার, সে বাজারে কিন্তু আমরা আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষিত করে পাঠাতে পারছিনা। আমরা একদিকে বলছি আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছি, আবার আমরাই আমাদের কর্মীদের সৌদি আরবে পাঠাচ্ছি গৃহকর্মী হিসেবে। আমরা যদি আমাদের কর্মীদের দক্ষ করে পাঠাতে পারতাম ইউরোপে, জাপানে, প্রশিক্ষিত কেয়ার গিভার, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, আইটি টেকনলজিস্ট, স্কিল ড্রাইভার - তাহলে আমাদের নারী কর্মীদের সুরক্ষা ও উন্নত আয়ের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারতাম – যেটা আমরা পারছিনা।
আরেকটা জিনিস এখানে গুরুত্বপূর্ণ, একজন কর্মীর যোগাযোগের দক্ষতা। আমাদের সমাজের একটি বড় শ্রেণী এখন মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করে। এই তরুণদের অনেকেই আরবী পড়ার পাশাপাশি কথাও বলতে পারে। তাকে যদি আমরা কোন একটা কাজে দক্ষ করে মধ্যপ্রাচ্য বা আরবী ভাষাভাষী দেশে পাঠাই, তাহলে আরবী ভাষা জানার কারণে সে কিন্তু একটু বাড়তি সুবিধা পাবে। সে কিন্তু তার যোগাযোগ বা আরবী ভাষা জানার কারণে দ্রুত তার আয় বাড়তে পারতো – যেটা আমরা পারছিনা। আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ট্যাক্সি ড্রাইভাররা কিন্তু মাসে একলাখের বেশী টাকা আয় করে। এখন আমরা যদি দক্ষ ড্রাইভার পাঠাতে পারতাম যে আরবী ভাষা জানে, তাহলে কিন্তু দ্রুত সে অনেক ভালো করতো।
এজন্যই আমরা দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষায় জোর দিচ্ছি। আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে হবে, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কোন না কোন প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। এর বিকল্প নেই।
সুইজারল্যান্ডে আমি যখন ঘুরতে যাই তখন শুনি তারা বলছে – সুইজারল্যান্ড রান বাই থ্রি এইচ। সুইজারল্যান্ডে অল্প কিছু লোক যারা হেড বা মাথা দিয়ে চিন্তা করবে যেমন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, চিন্তাবিদ।আরো কিছু লোক হার্ট বা হৃদয় দিয়ে কাজ করবে, যেমন ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক, কেয়ারগিভার। আর বাকি সবাই হ্যান্ড বা হাত দিয়ে কাজ করে এই সুইজারল্যান্ডকে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এই হ্যান্ড মানে হাত বা দক্ষ কারিগরি প্রশিক্ষিত জনশক্তি।
চলবে ...