Logo
×

Follow Us

মতামত

কানাডা: কতটা সম্ভাবনা, কতটা বাস্তবতা?

Icon

আবদুল্লাহ আল ইমরান

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৫, ১১:২১

কানাডা: কতটা সম্ভাবনা, কতটা বাস্তবতা?

শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় এক গন্তব্যের নাম নর্থ আমেরিকা। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, মর্যাদাপূর্ণ ডিগ্রি অর্জন আর উন্নত পেশা জীবন বেছে নেওয়ার স্বপ্ন তো আছেই, পাশাপাশি আছে স্থায়ী হওয়ার সুযোগও।

তবে এই সম্ভাবনাগুলো কি আর আগের মতো আছে? সাম্প্রতিক বাস্তবতায় বলা যায়, একসময় যে দরজা উন্মুক্ত ছিল, দ্রুতই তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রস্তুতি ছাড়া এখানে আসা মানে নির্মম এক বাস্তবতার ফাঁদে পড়া।

এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের চাকরির বাজারে সংকট চলছে। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বমুখী। দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটই কাজ পাচ্ছে না।

উচ্চ ডিগ্রিধারীদের দিকে তাকান। তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। শিল্পখাত উচ্চদক্ষতার লোকেদের চাকরি দিতে পারছে না। ওদিকে অর্থনীতি টালমাটাল, মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে, সঙ্গে আছে রাজনৈতিক অস্থিরতা।

সব মিলে তরুণদের হতাশা পৌঁছেছে চরমে। এই বাস্তবতায় অনেকে ভাবছেন, উচ্চশিক্ষার জন্য দেশত্যাগই বোধহয় একমাত্র সমাধান।

কিন্তু নর্থ আমেরিকাকে কি এখন আর সেই নিরাপদ ও সহজ এক্সিট রুট বলা যাবে?

এখানে ফান্ডিং দিন দিন কমছে। এক ধাক্কায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডিং কমেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। আইভি লিগসহ অন্যান্য নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আছে ট্রাম্পের পরবর্তী লিস্টে। ফলে ফুল-ফান্ডেড মাস্টার্স বা পিএইচডি আগের চেয়ে অনেক কঠিন। গবেষণা অনুদান সংকুচিত। স্কলারশিপ কমছে। টিএ/আরএ পাওয়াও প্রায় অনিশ্চিত।

বহু শিক্ষার্থী, যারা উচ্চাশা নিয়ে এখানে এসেছিলেন, তারা দেখছেন-তাদের আর্থিক সহায়তা ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। মানিয়ে নিতে অনেকে ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছেন, কেউ বা অবৈধভাবে কাজ করছেন। কাউকে আবার হতাশায় ড্রপ আউট হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, কানাডা বা আমেরিকায় শিক্ষা ব্যয় এখন আকাশচুম্বী। শুধু টিউশনই নয়, জীবনযাত্রার ব্যয়ও লাগামছাড়া। প্রধান শহরগুলোর বাসা ভাড়া দ্বিগুণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিক। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ব্যয়, যেমন- চিকিৎসা, কোর্স উপকরণ, যাতায়াত- শিক্ষার্থীদের চাপে ফেলে দিচ্ছে।

আগে পার্ট-টাইম কাজ করে টিকে থাকার সুযোগ ছিল, সেটিও এখন প্রায় অনিশ্চিত। ক্যাম্পাসের চাকরি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ভিসা নিয়মের কারণে অফ-ক্যাম্পাস কাজও কঠিন।

তবে অর্থনৈতিক এই লড়াইয়ের চেয়েও বড় যে সংকট আছে, তার নাম অভিবাসন! কেননা, শিক্ষার্থীরা এখানে শুধু যে ডিগ্রির জন্য আসেন, তা নয়। তারা ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়ও থাকেন। কিন্তু ছাত্র থেকে কর্মী, তারপর পিআর হওয়ার যে নিশ্চিত পথ এতদিন ছিল, তা কঠিন সব নিয়মের বেড়াজালে আটকে দিয়েছে ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট।

ভিসাও সীমিত করে ফেলেছে কানাডা। অ্যাপ্রুভাল পাওয়া এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। আর যারা ঢুকতে পারছেন, তারাও দেখছেন- গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশটিতে থাকার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট, যেটি পড়াশোনা শেষে সব শিক্ষার্থীকে দেওয়া হতো, সেখানে নতুন নানা জটিল নিয়ম যোগ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি শেষে থাকতে পারছেন না, কারণ এইচ১বি ভিসার লটারি সিস্টেমে তারা জায়গা পাননি। চাকরি না থাকলে ওয়ার্ক পারমিট নেই। আর ওয়ার্ক পারমিট না থাকলে কোনো ভবিষ্যৎও নেই।

কয়েক বছর সংগ্রাম শেষে একজন শিক্ষার্থী যখন উপলব্ধি করেন- সকল ত্যাগ, সঞ্চয় আর নির্ঘুম রাতের পর তার সামনে মাত্র একটি পথই খোলা আছে, আর তা হল- ব্যাগ গুছিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া, তখনই চূড়ান্ত হতাশার মুহূর্তটির দেখা মেলে।

অনেকে জানতে চান, তাদের সতর্ক করতেই এই লেখা লিখছি। একসময় উত্তর আমেরিকা অফুরন্ত সুযোগের যে প্রতিশ্রুতি দিত, তা আর আগের মতো নেই। এর পরও যারা ভাবেন এটি তেমন কঠিন হবে না, সামলে নিতে পারবেন, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। শেষ পর্যন্ত টিকে যান তারাই, যারা সুপরিকল্পিতভাবে এগোন, রওনা দেওয়ার আগে ফান্ডিং নিশ্চিত করেন এবং অবশ্যই বিকল্প রাখেন।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাই ভাবুন।

নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন : এটি কি সত্যিই সঠিক পদক্ষেপ? আপনি কি আর্থিক, মানসিক, এবং কৌশলগতভাবে প্রতিটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত? যদি কিছু ভুল হয়, তাহলে কী করবেন?

ভাবতে বলছি কারণ, একবার এই পথে পা রাখলে, পিছু হটার আর কোনো সুযোগ নেই। আপনি যদি পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে বর্তমান বাস্তবতায়, অন্তত আগামী কয়েক বছর, নর্থ আমেরিকা আপনার স্বপ্নই শুধু ভাঙবে না, দিনশেষে আপনাকেও গুড়িয়ে দেবে!

লেখক: আবদুল্লাহ আল ইমরান

কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক 

Logo