Logo
×

Follow Us

মতামত

শরিফুল হাসানের অভিমত - শেষ পর্ব

দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে অন্য দেশ, আমরা কেন পারছি না?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৫, ১৭:৫৭

দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে অন্য দেশ, আমরা কেন পারছি না?
শরিফুল হাসান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের একজন সহযোগী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানটির মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিষয়ে তার অভিমত। আজ থাকছে শেষ পর্ব।
আমাদের একটি বড় সম্পদ দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আমাদের অনেক আরবি ভাষা জানা হাফেজ আছেন। তারা যখন মধ্যপ্রাচ্যে যান, শুধু আরবি ভাষা জানার কারণে তারা উচ্চ বেতনে বিভিন্ন মসজিদে কাজ করেন। একজন ইমাম বা একজন মুয়াজ্জিন সে সব দেশে দেড় লক্ষ টাকার বেশি বেতনে কাজ করেন। এর কারণ তার ভাষা দক্ষতা। একজন আরবের সঙ্গে শুধু ভাষা দিয়ে যত ক্লোজ হওয়া যায়, অন্য কোনো দক্ষতায় তত ক্লোজ হওয়া যায় না।
শুধু কর্মীর কথা কেন বলি, আমাদের দেশের একজন কূটনীতিক কি মধ্যপ্রাচ্যে আরবি শিখে যান? পৃথিবীর অনেক দেশ কূটনীতিক নিয়োগ দেয়ার আগে সে দেশের ভাষা শেখায়। কিন্তু আমাদের খুব কম কূটনীতিকই মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন, যারা আরবি জানেন।
অন্যদিকে ভারত বলেন আর ফিলিপাইন বলেন, তারা যাকে যে দেশে পাঠায়, তাকে সে দেশের ভাষার ওপর আলাদা করে প্রশিক্ষণ দেয়। সেখারকার এয়ারপোর্টে যারা কাজ করছেন, তার বেশির ভাগই ফিলিপাইনের। ম্যানেজারিয়াল কাজে শ্রীলঙ্কানরা; আইটি, টেকনোলজিক্যাল কাজে দেখা যায় ভারতীয়দের। একজন ফিলিপাইন বা শ্রীলঙ্কান বা ভারতীয় এক মাসে যত আয় করছেন, আমাদের ৫০ জন অদক্ষ শ্রমিক তত আয় করছেন। ফলে আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় এই চিন্তার ছাপ থাকতে হবে।
আমরা মনে করি, দেশের লোক যে যেভাবে পারছে চলে যাক। এটা একটা দেশের কৌশল হতে পারে না। এখন আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের জোর দিতে হবে দক্ষ জনগোষ্ঠী কীভাবে পাঠানো যায়, কীভাবে অভিবাসন ব্যয় কমানো যায়, কীভাবে দালালমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিত করা যায়।
এই যে গত ১৬-১৭ বছরে ৪৫-৫০ হাজার প্রবাসীর লাশ এসেছে, যাদের মধ্য বয়সে জীবন থেমে গেছে। আমাদের অনেক নারী সেখানে সুরক্ষার অভাবে নিপীড়িত হয়ে ফিরেছেন – এসব বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
একজন প্রবাসী কীভাবে মর্যাদার সঙ্গে থাকবে, সুরক্ষার ভেতরে থাকবে; মিসকিন যে পরিচয়টা বাংলাদেশিদের তারা দেয়, সেখান থেকে বের হয়ে একটা সম্মানের জায়গায় কীভাবে নিজেদের নিয়ে যাওয়া যাবে, সেসব জায়গায় আমাদের অনেক কিছু করার আছে।
যে প্রবাসীরা বছর শেষে আমাদের ২৭ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছেন, সে মন্ত্রণালয়ের বাজেট হচ্ছে সবচেয়ে কম বরাদ্দের একটি। প্রবাসীরা পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট পার হওয়া, দূতাবাসের সেবা নিতে যে কত রকম হয়রানি… আমরা যদি আমাদের নাগরিকদের সম্মান না করি, পৃথিবীর কেউই আমাদের সম্মান করবে না। আমরা যদি আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা দিই, সুরক্ষা দিই– পৃথিবীর সব দেশ দিতে বাধ্য।আমরা যদি আমাদের নাগরিকদের সম্মান না করি, পৃথিবীর কেউই আমাদের সম্মান করবে না। আমরা যদি আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা দিই, সুরক্ষা দিই– পৃথিবীর সব দেশ দিতে বাধ্য।
আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যে শ্রমিক বা কর্মীরা দেশের বাইরে আছেন, তাদের কিন্তু কেউ নাগরিকত্ব দেবে না। কালকে যদি আমার ১ কোটি লোক ফেরত আসে, তাহলে আমার রাষ্ট্রের কী ব্যবস্থাপনাটা রয়েছে? আমাদের কিন্তু সে রকম কোনো প্রস্তুতি নেই।
১৫-২০ বছর কাজ করে যে প্রবাসীর দক্ষ হয়ে ফেরত এলো, তাকে কীভাবে কাজে লাগানো যাবে, যে অদক্ষ শ্রমিকটি দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হলো, তাকে কীভাবে সামাজিক পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে; রাষ্ট্রের কিন্তু সেই পরিকল্পনা গ্রহণে অনেক ঘাটতি আছে। এর পাশাপাশি একজন শ্রমিক আজ ঢাকা বিমানবন্দরে ফেরত এলে, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন বা অসুস্থ নারী ফেরত এলে কার কী ভূমিকা, সিভিল এভিয়েশন কী করবে, কল্যাণ ডেস্ক কী করবে; তা নিয়ে ভাবতে হবে। এর পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসন, অবৈধ পথে যারা যাচ্ছেন, যে কোনো মূল্যে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করবে; সেটা আমাদের দেশের জন্য অসম্মানের।
অভিবাসন  একটা পছন্দের বিষয় হবে। মানুষ ইচ্ছা হলে বিদেশ যাবে, কিন্তু তাকে যেন বাধ্য হতে না হয়। জলবায়ু পরিবর্তন বলি, সুশাসনের ঘাটতি বলি, দুর্যোগ বলি; তার যেন মনে না হয় যে, এ দেশ না ছাড়লে বাঁচব না।
দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ একসময় বিভিন্ন দেশে যেত, কিন্তু এক পর্যায়ে তারা দেশে ফিরে আসে ও বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ছোট ছোট শিল্প কারখানা গড়ে তোলে। ভারতের আইটি বিশেষজ্ঞ, দক্ষ কর্মীরাও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরে আসে। দেশে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। সে  জায়গায় কিন্তু আমরা আমাদের প্রবাসীদের কাজে লাগাতে পারছি না। সে জায়গাগুলো আমাদের ভাবা উচিত ও কাজ করা উচিত।
সমাপ্ত।

Logo