Logo
×

Follow Us

মতামত

বিশেষ সাক্ষাৎকার (শেষ পর্ব) - ড. তাসনিম সিদ্দিকী

নিবন্ধন করেও কি কমছে দালালদের দৌরাত্ম্য?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫, ০৯:৩৭

নিবন্ধন করেও কি কমছে দালালদের দৌরাত্ম্য?

(ড. তাসনিম সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তার মূল গবেষণা আন্তর্জাতিক অভিবাসন নিয়ে। ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট- রামরুর তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার। অন্তর্বর্তী সরকারের ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য তিনি। অভিবাসন সমস্যা ও শ্রমবাজার নিয়ে মাইগ্রেশন কনসার্নের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ড. সিদ্দিকী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শোভন আরেফ। শ্রমবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, দালাল নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে মতামত দিয়েছেন তিনি। )

মাইগ্রেশন কনসার্ন : ড. সিদ্দিকী, আমরা জানি - আমাদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে দালালদের একটা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা অংশগ্রহণ থাকে। আমাদের বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীরা সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে আসে না। আমরা যতই সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিই না কেন, দালালমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিত করা যাবে কীভাবে?

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : অভিবাসনের বিষয়টি অনেক বেশি জটিল, বিশেষ করে রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে। মাঠ পর্যায়ের যে রিক্রুটমেন্ট, সেটি কিন্তু দালাল বা এজেন্ট ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ আমাদের সব রিক্রুটিং এজেন্সি ঢাকা শহরে অবস্থিত। এই বাস্তবতাটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারকে অনুধাবন করানোর চেষ্টা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে দালাল রেগুলারাইজ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পদক্ষেপগুলো কিন্তু বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি বা হচ্ছে না। কিংবা এমনভাবে দালাল নিবন্ধনের জায়গায় আমরা যাচ্ছি, যেটি দিয়ে আসলে কাজ সম্ভব হচ্ছে না।

গ্রামের যে মানুষটি বিদেশে যেতে চান, তারপক্ষে সরাসরি অনেক কিছু জানার উপায় নেই বা ওয়েবসাইট ব্যবহার অনেক কিছু যাচাই করবেন- সে সুযোগও কম থাকে। ফলে তারা নির্ভর করে গ্রামে তাদের আশপাশে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং তাদের মাধ্যমে ‘দালাল’ এর ওপরে। এখন এই দালালই কিন্তু যোগসূত্র হয় রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে। এখন এই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রচুর প্রতারণার বিষয় জড়িত হয়ে যায়, প্রচুর জালিয়াতি এখানে হয়। আমাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৯ শতাংশ অভিবাসন প্রত্যাশী ব্যক্তি টাকা দিয়েও বিদেশে যেতে পারেন না। আর প্রায় ৩২ শতাংশ অন্য দেশে গিয়ে নানারকমের হয়রানির শিকার হন। বাকি ৫১ শতাংশ মানুষ ভালো অভিবাসন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়ে ফিরে আসেন।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : সে ক্ষেত্রে এই দালালদের কি কোনোভাবে অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা যায়?

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : আসলে এই পরিস্থিতির মধ্যে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীকে নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্যে যে সংস্কার বা রিফর্ম আমরা প্রস্তাব করেছিলাম, সে দিকে এই অন্তর্বর্তী সরকারও যায়নি। আমাদের প্রস্তাব ছিল, ধরুন যদি বাংলাদেশে ১০ হাজার দালাল বা এজেন্ট থেকে থাকে, সে ক্ষেত্রে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিএমইটি বা বায়রা তাদের সব রকম খোঁজ-খবর নিয়ে, প্রয়োজনে পুলিশ ভেরিফিকেশন করে একটি তালিকা তৈরি করে অনলাইনে দিয়ে রাখবে। সেই লিস্ট থেকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রয়োজনীয় এলাকায় তাদের লোক নিয়োগ করতে পারবে। সেই এলাকায় যদি কোনো প্রতারণার বিষয় ঘটে, তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতে পারবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষ থেকেও হয়ে থাকে, যা কিনা দালালের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এ রকম দুই দিক থেকেই হলে, অর্থাৎ দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সি উভয়ের সমস্যা থাকলে সে ক্ষেত্রে ক্লিয়ারেন্স ফর্মে তা উল্লেখ করা যাবে। তখন এমন সমস্যা সহজেই মীমাংসার দিকে যাবে। এভাবে প্রতারণার হারও কমে আসবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা সেই অবস্থায় যেতে পারিনি।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : সরকারের অন্যান্য সংস্থার মতো ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইনে নিবন্ধন কি সম্ভব নয়?

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : এখনো সরকারি কর্মচারীরা মনে করেন যে, তারা একটা অনলাইন ব্যবস্থা করবেন। যাতে সেখান থেকেই সব তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু এমনটা অতীতেও করা হয়েছে, সফলতা এখনো আসেনি। বরং, অন্যান্য ক্ষেত্রে, ধরুন যেভাবে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়োগ দেয়া হয়, আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে লোক নিয়োগ দেয়া হয়- আমি মনে করি সেভাবেই এই ‘দালাল ব্যবস্থাটি’কে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়াই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : কিন্তু অভিবাসন প্রক্রিয়ায় এই প্রতারণা রোধে তো প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আইন কার্যকরে সরকারের বাধা কোথায়?

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : হ্যাঁ, সরকার আইন করেছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ যেভাবে হচ্ছে সেটি কার্যকর হচ্ছে না। সরকার প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে বলেছে, আপনারা ১০ জন করে দালালের নাম দিন এবং শুধু তাদের মাধ্যমেই রিক্রুট করুন। এটি আসলে বাস্তবে কখনোই সম্ভব নয়। সারাদেশে মাত্র ১০ জন এজেন্ট বা দালাল দিয়ে কি একটি এজেন্সি তাদের লোক সংগ্রহ করতে পারবে? পারবে না। এজেন্সিকে আসলে এমন একটা সুযোগ দিতে হবে, যাতে করে এলাকাভিত্তিক মানুষ সংগ্রহ করতে পারে। আর তার জন্য দরকার ‘দালাল’দের একটা তথ্য ভান্ডার বা ডাটাবেজ।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : সে ক্ষেত্রে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর উপায় কী হবে বলে আপনি মনে করেন?

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : আগেই বলেছি সেসব ব্যক্তির সব তথ্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে যাচাই করে তারপর সেই তথ্য ভান্ডারে নিবন্ধিত করা হবে। এই সংক্রান্ত একটি সিস্টেম ডেভেলপ করা হবে। যে সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি পদে তাদের পরীক্ষা করা যাবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএমইটির কাছে এর নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। আর যদি বায়রা এই তথ্য ভান্ডার বা ডাটাবেজ করতে পারে, তাহলে তারা চাইলে প্রতিটি রিক্রুটিং এর জন্যে একটি ফি সেখানে নির্ধারণ করতে পারবে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি এই ডাটাবেজ থেকে সেবা নেবে, তারা এর পরিবর্তে মূল্য পরিশোধ করলে সিস্টেমটা কার্যকর হতে পারে। এভাবেই কিন্তু একটা ‘রিসোর্স’ এখানে তৈরি হয়ে যাচ্ছে বায়রার জন্য এবং এই কাজটি পরিচালনাও সফল হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : ড. তাসনিম সিদ্দিকী, আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. তাসনিম সিদ্দিকী : আপনাকেও ধন্যবাদ

Logo