আমাদের Life থেকে f-টা বাদ পড়ে গেছে, শুধু Lie নিয়ে পড়ে আছি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৫, ১২:০৪

(কাসেম ওয়ালিদ গাজাভিত্তিক একজন পদার্থবিদ, যিনি প্রকৃতিকে শুধু প্রতীক ও সংখ্যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন না, বরং শব্দের মাধ্যমেও জীবন্তভাবে ফিলিস্তিনের প্রতিদিনের বাস্তবতা ও প্রকৃতি তুলে ধরেন। তিনি খণ্ডকালীন সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেন, এবং তার লেখা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে)
আমরা গাজার মানুষ বারবার হুমকির মুখে পড়েছি। আমাদের বলা হয়েছে- আমাদের ‘পরিষ্কার’ করে দেওয়া হবে, আমাদের গণহত্যার শিকার হতে হবে, আমাদের ওপর ‘নরকের দরজা’ খুলে যাবে।
কিন্তু সত্য হলো, আমরা ইতোমধ্যেই নরকের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি গাজার আরও দুই মিলিয়ন ফিলিস্তিনির মতো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব গণহত্যার inferno বা নরক থেকে বেঁচে আছি।
বেঁচে থাকার একমাত্র পথ: মিথ্যার আশ্রয়
আমার সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকা বলতে কিছু নেই। আমি টিকে আছি শুধু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। জীবন (life)-এর "f" বাদ দিয়ে শুধু "lie" (মিথ্যা) ধরে রেখেছি।
এই মিথ্যার আশ্রয় আমি প্রথম নিয়েছিলাম অনেক আগেই। ২০০৮-০৯ সালে যখন গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন চলছিল, তখন বলেছিলাম— এমন যুদ্ধ আর কখনো দেখব না। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।
আমি যুদ্ধ দেখলাম ২০১২ সালে, আবার ২০১৪ সালে, ২০২১ সালে এবং আরো একবার ২০২৩ সালের মে মাসে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন গাজার আকাশজুড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান তাণ্ডব চালাচ্ছিল, আমি আমার মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমরা জানতাম, আমাদের জীবন শেষ হয়ে আসছে।
কিন্তু মানুষ সহজে মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে না। তাই আমি আবারো মিথ্যার আশ্রয় নিলাম।
১৭ অক্টোবর, ২০২৩; ইসরায়েল যখন আল-আহলি ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতাল বোমা হামলা চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করল, তখন আমি আবার মিথ্যা বললাম। মনে মনে বললাম, এবার বিশ্ব জেগে উঠবে। কিন্তু তা হলো না, বরং বোমাবর্ষণ আরো ভয়াবহ হলো।
ডিসেম্বর, ২০২৩; যখন ইসরায়েল আমাকে গাজা থেকে জোরপূর্বক বের করে দিল, আমি বললাম, ‘কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসব’। কিন্তু বাস্তবে, আমি সাতবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমি যখন সপ্তমবারের মতো ফিরে এলাম, তখন দেখলাম গাজায় ত্রাণ প্রবেশ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমি আবারো মিথ্যা বললাম- বিশ্ব আমাদের না খেতে দিয়ে মরতে দেবে না। কিন্তু বিশ্ব আমাদের না খেয়ে মরতে দিয়েছে।
আমার পরিবার টানা কয়েক সপ্তাহ শুধু রুটি, জাআতার আর কয়েকটি টুনা মাছের ক্যানের ওপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল।
আমার সবচেয়ে বড় মিথ্যা ছিল, যখন প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি শুরু হলো। আমি মনে করলাম, ‘এটাই শেষ, ইসরায়েলের আর কিছুই করার নেই।’
কিন্তু আমি জানতাম, আমি মিথ্যা বলছি।
রমজান শুরু হওয়ার পর ইসরায়েল সমস্ত ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়, নতুন করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। তারপর, দুই সপ্তাহ পর, ভোরে সেহরির আজানের পরিবর্তে আমরা জেগে উঠলাম প্রচণ্ড বোমার শব্দে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার শতাধিক মানুষ মারা গেল, যার মধ্যে অন্তত ১০০ ছিল শিশু।
শেষ পর্ব কি এখন? নাকি আরো ভয়াবহ কিছু বাকি?
আমরা জানি না, এটি শেষ পর্ব কিনা। ইসরায়েল কি এখানেই থামবে, নাকি আরো নির্মম কিছু ঘটতে যাচ্ছে?
যদি ইসরায়েল বলে তাদের হামলার উদ্দেশ্য বন্দিদের মুক্ত করা, তাহলে যুদ্ধবিরতি কেন হয়েছিল?
বিশ্ব আবারো শুধু ‘নিন্দা’ জানিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। আমরা এতবার ধোঁকা খেয়েছি যে, এখন গুনতেও ভুলে গেছি।
আমি বেঁচে থাকতে চাই, মিথ্যা বলে নয়— সত্যের আশায়
আমি যুদ্ধের মধ্যে বড় হয়েছি। ১৫ মাস ধরে গণহত্যার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছি, তবুও আমি ভয় পাচ্ছি। আমি ভাবতাম, এত ভয় পাওয়ার পর একসময় আমি অভ্যস্ত হয়ে যাব, কিন্তু না— আমি এখনো কাঁপছি।
আমি চাই একটা সাধারণ জীবন, যেখানে না থাকবে বোমা, না থাকবে দুর্ভিক্ষ, না থাকবে ভয়। আমি আর মিথ্যার আশ্রয় নিতে চাই না। আমি বাস্তবের জীবনে বাঁচতে চাই।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরায় প্রকাশিত কলাম