Logo
×

Follow Us

মতামত

বিশেষ সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব) - মোঃ শাহীন ইকবাল, ডিএমডি, ব্র্যাক ব্যাংক

ব্যাংকিং চ্যানেলে আস্থা হুন্ডিতে নয়, ফলে বাড়ছে রেমিট্যান্স

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৫, ১৭:৫৭

ব্যাংকিং চ্যানেলে আস্থা হুন্ডিতে নয়, ফলে বাড়ছে রেমিট্যান্স
(মোঃ শাহীন ইকবাল, সিএফএ; বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ডিএমডি এবং হেড অব ট্রেজারি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি রেমিট্যান্স আনার তালিকায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছে। রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় মোঃ শাহীন ইকবাল একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক। ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার সিএফএ ইনস্টিটিউট থেকে চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। তার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, চট্টগ্রাম (বর্তমানে চুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশের সাম্প্রতিক রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে মোঃ শাহীন ইকবালের সাথে কথা বলেছেন মাইগ্রেশন কনসার্নের হেড অব নিউজ মাহবুব স্মারক)

মাইগ্রেশন কনসার্ন : রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক সম্প্রতি দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে। এ সাফল্যের পেছনে কী কারণ? কেন প্রবাসী গ্রাহকরা ব্র্যাক ব্যাংককে তাদের আস্থার জায়গায় নিয়েছে?

মোঃ শাহীন ইকবাল : ধন্যবাদ, রেমিট্যান্স খাতে ব্র্যাক ব্যাংকের এই অর্জন হঠাৎ করে হয়নি। গত দুই বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের গ্র্যাজুয়েলি প্রোগ্রেশন হয়েছে। গত বছর আমরা চার নম্বরে ছিলাম, এ বছর তিন নম্বরে এসেছি। ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যাবো। এটা আমাদের পার্টিকুলার ফোকাস এরিয়া- রেমিট্যান্স কীভাবে বাড়ানো যায় এবং সার্ভিসটা কীভাবে ইম্প্রুভ করা যায়।

এ সার্ভিস ইম্প্রুভমেন্টে আমরা কী করেছি, প্রথমত আমাদের টেকনোলজিকাল ব্যাকবোন বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্ট্রং করেছি, আমাদের একটা ডেডিকেটেড টিম আছে টেকনোলজির, যাতে বিদেশ থেকে একজন প্রবাসীর যখন টাকা পাঠায়, গ্রাহক যাতে তাৎক্ষণিক টাকাটা পায়, সেটা এনসিউর করা। মানে ওখান থেকে আপনি টাকা পাঠাবেন, উইদিন সেকেন্ডস এখানের একাউন্টে যেন টাকাটা জমা হয়ে যায়। শুধু ব্র্যাক ব্যাংকের একাউন্টে নয়, যে কোনো ব্যাংকের একাউন্টে কিংবা বিকাশে এক মিনিটেই যেন টাকাটা জমা হয়ে যায়– গ্রাহক টাকাটা পেয়ে যায়। এই যে ইন্টিগ্রেশন– এই টেকনোলজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার; এটার ওপরই আমরা জোর দিয়েছি গত দুই বছরে এবং বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আমরা এই ইন্টিগ্রেশন করতে পেরেছি। এতে করে গ্রাহক তাৎক্ষণিক সার্ভিস পাচ্ছেন। ৫ মিনিট পরে টাকা পাওয়ার চেয়ে তাৎক্ষণিক ১ মিনিটে টাকা পাওয়ার সার্ভিসটাই সবাই চায়। আমরাও এটার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : সেটা করতে গিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বা নিয়েছে?

মোঃ শাহীন ইকবাল : আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ইন্টিগ্রেশনে জোর দিচ্ছি। পুরো সিস্টেমটা অটোমেশন করছি, যাতে কোনো মেন্যুয়াল ইনপুট এটার মধ্যে যেন না থাকে। এ ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ নিখুঁত করা হয়েছে, যাতে কোনো ভুল না হয়। এছাড়া আমাদের যারা রেমিট্যান্স পাঠায়, তাদের জন্য বিভিন্ন সার্ভিস চালু করা হয়েছে। তাদের জন্য যাবতীয় প্রোডাক্ট সল্যুশন আমরা রেডি করেছি। যেমন, যে কেউ এখন যে কোনো স্থান থেকেই, মানে বাড়িতে বসেও আমাদের একাউন্ট করতে পারছে। বিদেশে কেউ বসে আছে, সেখানে থেকেই তিনি সব জায়গায় একাউন্ট করতে পারবেন। নতুনভাবে চালু করেছি ভার্চুয়াল কার্ড, যা তিনি ভার্চুয়ালি পাবেন। এই সার্ভিসের মাধ্যমে যাবতীয় ব্যাংকিং সেবা ঘরে বসেই পাবেন একজন গ্রাহক। ব্যাংকে বা বিকাশে টাকা পাঠানো, ডিপিএস খোলা, এফডিআর খোলাসহ সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম বিশ্বের যে কোনো দেশে বসেই করা সম্ভব। একই রকম সুবিধা বা সার্ভিস প্রবাসীর পরিবারবর্গও দেশে বসে উপভোগ করতে পারবেন। এটা একটা কম্প্লিট প্যাকেজ সেবা।

আমাদের অপারেশন্স, আমাদের টেকনোলজি, আমাদের ব্রাঞ্চ ও আমাদের এজেন্ট; যে কোনো স্থানেই সমান সেবা প্রদান করার নিশ্চয়তা দেয়া হয় সমান গুরুত্বের সাথে। এ সব সেবার মান গ্রাহক পর্যায়ে প্রমাণিত হওয়াতেই আজ ব্র্যাক ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রবাহে গ্রাহকের এতখানি আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছে।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : ব্যাংকিং ব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারের যে প্রবণতা সেটা মোকাবিলায় আমাদের ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকিং সিস্টেম কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?

মোঃ শাহীন ইকবাল : দেখেন, আমরা যদি বিগত ৫-৬ মাসের রেমিট্যান্স ফিগার দেখি, তাতে মনে হচ্ছে হুন্ডি ব্যবস্থায় কিছু ইম্প্যাক্ট পড়েছে। কারণ, হুন্ডি ব্যবসায়ীরা বাড়িতে গিয়ে যে সার্ভিস দিচ্ছে, এখন আমাদের এজেন্টরাও সেই সার্ভিস দিচ্ছে। তারাও বাড়ির কাছাকাছি সেবা নিয়ে যাচ্ছে। বিকাশের মতো সার্ভিস বাড়িতে বাড়িতে আছে। ফলে হুন্ডিতে আগে বেশি মানুষ যেত, এখন কম যাচ্ছে। এর দুটি কারণ, প্রথমত হুন্ডিতে রিস্ক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা মার যেতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের টাকার সে ঝুঁকি নেই। ফলে ব্যাংকিং লেনদেনে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে বিশ্বাস রাখছে। দ্বিতীয় কারণ হলো – হুন্ডিতে বিদেশ থেকে যেমন টাকা পাঠানোর রিকোয়ার্মেন্ট থাকে, তেমনি দেশ থেকেও টাকা পাঠানোর জোগান থাকতে হবে। এই চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের ওপর হুন্ডি সিস্টেমটা ফাংশন করে। এর ব্যত্যয় হলে সে সিস্টেম কাজ করে না। বিগত ৫-৬ মাসে এ ব্যবস্থায় চাহিদা-জোগানে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। একই সাথে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহজতর হওয়াতে গ্রাহকরা ধীরে ধীরে হুন্ডি থেকে মুখ ঘোরাচ্ছে। 

মাইগ্রেশন কনসার্ন : আপনি বলছেন, প্রবাসীরা ধীরে ধীরে হুন্ডি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। এ কাজে আর কোনো কিছু কী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে?

মোঃ শাহীন ইকবাল : বাংলাদেশ সরকার এখন রেমিট্যান্সে ২.৫ পার্সেন্ট ইনসেন্টিভস দিচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে যেখানে ১২২ টাকা হারে ডলারের বিপরীতে টাকা দিচ্ছে, সেটার সাথে আরো ২.৫ টাকা যোগ হচ্ছে। ফলে গ্রাহক প্রায় ১২৫ টাকার মতো পাচ্ছেন। এতো টাকা কিন্তু হুন্ডি থেকে পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল এখন হুন্ডি চ্যানেল থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তারপরও কিছু টাকা আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। হয়তো কোনো প্রবাসী ভাইর প্রোপার ডকুমেন্ট নেই। তিনি যখন টাকা পাঠান, সেটা প্রোপার চ্যানেলে পাঠাতে পারছেন না। এমন কিছু টাকা এখনো আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। তারপরও সব মিলিয়ে এখন ব্যাংকিং চ্যানেল অধিক নির্ভরশীল, ঝুঁকিমুক্ত, লাভজনক ও উপকারী। এমন অসংখ্য সুবিধার কারণে দিন দিন ব্যাংকিং চ্যানেল প্রবাসীদের কাছে বেশি আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠছে।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : তার মানে প্রবাসীদের আর হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন নেই?

মোঃ শাহিন ইকবাল : প্রবাসীরা যারা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে পারেন, তাদের হুন্ডিতে পাঠানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে বেশি রেইট পাচ্ছেন, ঝুঁকিহীন লেনদেন করছেন। ফলে হুন্ডিতে কেন পাঠাবেন? নিরাপদে টাকা আসছে, বেশি হারে টাকা আসছে, জমা টাকায় ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলই এখন হুন্ডির চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।

চলবে…

Logo