বিশেষ সাক্ষাৎকার (দ্বিতীয় পর্ব) - মোঃ শাহীন ইকবাল, ডিএমডি, ব্র্যাক ব্যাংক
কর্মীরা দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে রেমিট্যান্স বাড়বে চার গুণ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৫, ১৮:০২

(মোঃ শাহীন ইকবাল, সিএফএ; বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ডিএমডি এবং হেড অব ট্রেজারি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি রেমিট্যান্স আনার তালিকায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছে। রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় মোঃ শাহীন ইকবাল একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক। জনাব ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার সিএফএ ইনস্টিটিউট থেকে চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। তার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, চট্টগ্রাম (বর্তমানে চুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশের সাম্প্রতিক রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে মোঃ শাহীন ইকবালের সাথে কথা বলেছেন মাইগ্রেশন কনসার্নের হেড অব নিউজ মাহবুব স্মারক)
মাইগ্রেশন কনসার্ন : আমাদের প্রবাসী কর্মীদের একটা বড় অংশ প্রযুক্তিবান্ধব নয়। তারা অনেকে জানে না কীভাবে টাকা পাঠাতে হয়, ব্যাংকিং রেইট কত, ব্যাংকিং অ্যাপস কীভাবে কাজ করে। ফলে এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া বা সচেতন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা কি আপনারা অনুভব করেন?
মোঃ শাহীন ইকবাল : আমি মনে করি, টাকা পাঠানোর জন্য যতটুকু জ্ঞান দরকার, ততটুকু কিন্তু আমাদের প্রবাসী ভাইদের আছে। তারা ঠিকই রাস্তা খুঁজে বের করছেন। একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করছেন। বিভিন্ন জায়গায় একটা চ্যালেঞ্জ থাকে, কাজের অবসরে যেটুকু সময় ওনারা পান ওটুকু সময়ে কর্মস্থলের কাছাকাছি কোন জায়গা থেকে টাকা পাঠাবেন। কারণ ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে টাকা পাঠানো ওনাদের অনেকের পক্ষে সম্ভব না হয়তো। যে কারণে হুন্ডিওয়ালারা বেনিফিট পায়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় ফর্মাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক কেওয়াইসির মাধ্যমে নিজেই একাউন্ট খুলে নিজেই লেনদেন করতে পারেন। সবাই হয়তো এই তথ্য জানেন না। এটা আমাদের দায়িত্ব। আমরা ফেসবুক, টিকটকসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানানোর চেষ্টা করছি। আমরা একাউন্ট ওপেনিংসহ পুরো সিস্টেমের একটা ভিডিও টিউটোরিয়ালস তৈরি করছি, যেখানে আমরা ডিটেইলস বলে দেব কীভাবে স্টেপ বাই স্টেপ একজন গ্রাহক একাউন্ট ওপেন করতে পারেন। আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্নভাবে ওনাদের কাছে পৌঁছানো ও বোঝানোর জন্য, যাতে করে ওনারা প্রপারলি কাজটা করতে পারেন। একবার যদি গ্রাহক তার মোবাইলে একাউন্ট ওপেন করে ফেলে, এরপর তিনি নিজেই নিয়মিত ওনার লেনদেন মনিটর করতে পারবেন, কত টাকা জমা আছে, কত টাকা তোলা হয়েছে, কত টাকা পাঠানো হয়েছে। উনি তখন চাইলেই ওনার স্ত্রী, ভাই, পরিবারের কাছে যে কোনো সময় টাকা ট্রান্সফার করতে পারবেন, চাইলেই ডিপিএস, এফডিআরে ডিপোজিট করতে পারবেন। এ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাই আমরা একটা অ্যাপের মধ্যে নিয়ে আসছি।
মাইগ্রেশন কনসার্ন : একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতারণা। অর্থ লেনদেনে ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে কীভাবে একজন প্রবাসী প্রতারিত হতে পারেন?
মোঃ শাহীন ইকবাল : প্রথমত হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনে সবচেয়ে বেশি প্রতারণার সুযোগ আছে। ফলে একজন প্রবাসীকে হুন্ডি থেকে দূরে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত নিজের ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করতে হবে। অন্যের একাউন্টে লেনদেনেও কিছু ঝুঁকির সুযোগ থাকে। নিজের ব্যাংক একাউন্ট তথ্যটি গোপন রাখার দায়িত্ব একাউন্ট হোল্ডারের নিজের। ওনার একাউন্ট ডিটেইল, ট্রানজেকশন ডিটেইল, গোপন পিন নাম্বার- এগুলো কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না। এটা সবার জন্যই সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। গ্রাহকের যদি কখনো মনে হয় যে, গোপন তথ্য ফাঁস হবার আশঙ্কা রয়েছে, সাথে সাথে ব্যাংকে জানানো প্রয়োজন।
মাইগ্রেশন কনসার্ন : ঈদ রেমিট্যান্স পাঠানোর সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। এই ঈদকেন্দ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহে আপনাদের কেমন প্রস্তুতি থাকে?
মোঃ শাহীন ইকবাল : প্রতি বছরই ঈদকেন্দ্রিক আমাদের ব্র্যাক ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম করে থাকে। কোনো কোনো ব্যাংক রেমিট্যান্স পাঠালে গিফট দেয়, কেউ স্পেশাল সার্ভিস দেয়। এবার আমরা রেমিট্যান্স প্রেরক ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম চালু করেছি – প্রবাসীর পরিবার ও তারা প্রবাসীর পরিবার। প্রবাসীর পরিবারের নারী সদস্যদের আমরা বলছি তারা বা স্টার। তাদের জন্য আমরা স্পেশাল ইন্টারেস্ট অফার করছি। তারা যে কোনো এমাউন্ট সেভিংসের ওপর সাড়ে তিন পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন। এই স্টার গ্রাহকরা হেলথ ইন্স্যুরেন্স, লাইফ ইন্স্যুরেন্স পাবেন বিভিন্ন রকম। এক বছর একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স ফ্রি সার্ভিস পাবেন। এই ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রেরক ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্যই ব্র্যাক ব্যাংক স্পেশালি চালু করেছে। ব্র্যাক ব্যাংক আশা করছে প্রবাসীর ভাইরা এই অফার নিয়ে সঠিক ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাবে। এতে প্রবাসীদের পাশাপাশি ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতি লাভবান হয়। এজন্য ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতিটি শাখাকে বিশেষ নির্দেশনা ও তরল অর্থ দেয়া হয়েছে। যাতে প্রতিটি প্রবাসীর পরিবারই প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে ব্যাংক থেকে যেতে পারেন। একই সাথে সব এটিএম বুথেও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে।
মাইগ্রেশন কনসার্ন : গত নভেম্বর থেকে চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাদের ব্যাংকিং চ্যানেলের সাথে সম্পৃক্ত করতে বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর থেকে কোনো উদ্যোগ কি নিয়েছেন আপনারা?
মোঃ শাহীন ইকবাল : এটা অত্যন্ত ভালো একটি বিষয়। আমরা এরই মধ্যে যারা বিদেশে কর্মী পাঠানো নিয়ে কাজ করেন– এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ শুরু করেছি, যাতে শ্রমিক, কর্মীরা দেশে থেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত হয়ে বিদেশে যেতে পারেন। ফলে বিদেশ গিয়ে একাউন্ট খোলার জটিলতায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশে থেকেই অর্থ লেনদেনের যাবতীয় কার্যক্রম সমাধা করে গেলে বাকি কাজ সহজ হয়ে যাবে। আমরা এই যৌথ উদ্যোগে জোর দিচ্ছি।
মাইগ্রেশন কনসার্ন : আমরা জানি আমাদের যে শ্রমিক বা কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অদক্ষ। ফলে প্রতি বছর যে ২৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে আসছে, সেটা তিন গুণ হতে পারে যদি এই শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলা যায়। এই দক্ষ কর্মী তৈরিতে ব্র্যাক ব্যাংক কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
মোঃ শাহীন ইকবাল : ধন্যবাদ, এ বছর এখন পর্যন্ত যে ট্রেন্ড আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে রেমিট্যান্স ২৪ বিলিয়নের জায়গায় ২৯ বিলিয়ন হয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। হ্যাঁ, এই জনশক্তি যদি দক্ষ কর্মীতে রূপান্তর করা যায়, সে ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স তিন-চার গুণ হয়ে যাবে। এ উদ্যোগটা সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ের নিতে হবে। ব্যাংক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব উদ্যোগের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। কারণ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট কাজ আছে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি উদ্যোগকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা পার্টনারশিপে যেতে প্রস্তুত।
মাইগ্রেশন কনসার্ন : রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরো গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো কী কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? এনআইডির পাশাপাশি প্রবাসীদের পাসপোর্টের মাধ্যমে একাউন্ট খোলার ব্যবস্থাটা কী রাখা দরকার বলে মনে করেন?
মোঃ শাহীন ইকবাল : বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ও সাপোর্টিভ। তবে কিছু এরিয়া আছে, যেমন কেউ যদি কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসায় রেমিট্যান্স পাঠাতে চায়, সে ক্ষেত্রে কিছু লিমিটেশন আছে। আরেকটা আছে ফরেন কারেন্সি রেমিট্যান্স শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাতে পারে, কোনো এক্সচেইঞ্জ হাউসের মাধ্যমে পাঠানো যায় না। এটাকে একটা সার্টেইন এমাউন্ট পর্যন্ত হয়তো এলাউ করা যেতে পারে। আবার একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য একজন গ্রাহকের এনআইডি থাকতে হয়। অনেক প্রবাসীর এনআইডি নেই কিন্তু পাসপোর্ট আছে। যদি শুধু পাসপোর্টের মাধ্যমে একাউন্ট খোলার সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো আরো বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার সুযোগ হতো আমাদের। মানে এসব সুবিধা যদি অ্যালাউ করা হয়, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি পজেটিভ ইম্প্যাক্ট পড়বে। আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখছে, আড়াই পার্সেন্ট ইন্সেন্টিভ দিচ্ছে– এটা কিন্তু আমাদের জন্য একটি বাড়তি খরচ। পুরো সিস্টেমকে এমন করতে হবে, যে কোনো ইন্সেন্টিভ ছাড়াই যেন আমাদের রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে পারে। সেভাবেই আমাদের প্রবাসী ভাইদের উৎসাহিত করতে হবে।
মাইগ্রেশন কনসার্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।
মোঃ শাহীন ইকবাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।