অভিবাসন ইস্যুতে মোদি ও ট্রাম্পের মিল, বাড়তে পারে অস্থিরতা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০৪

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন বিষয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতীয় অভিবাসীদের বিতাড়ন ইস্যুতে মোদির নীরব প্রতিক্রিয়া এই সমন্বিত অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শত শত ভারতীয়কে সামরিক বিমানে হাতকড়া পরিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এই দৃশ্য ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীদলীয় নেতারা সংসদের বাইরে প্রতীকীভাবে হাতকড়া পরে প্রতিবাদ জানান এবং মোদির কাছে ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার দাবি জানান।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সফরে মোদি অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেননি। তিনি বরং বলেন, "আমাদের সরকার অবৈধ অভিবাসীদের ফেরানোর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।" পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, অনেক ভারতীয়কে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যা মানব পাচারের একটি অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদির প্রতিক্রিয়া তার "উন্নত ভারত" প্রচারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, ভারত বর্তমানে ব্যাপক বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে।
ভারতের শীর্ষ ১% জনগোষ্ঠী দেশের ৪০% সম্পদের মালিক।
২৩.৪ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ভারতে ১৯১ জন বিলিয়নিয়ার ছিল, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
এই চরম বৈষম্যের কারণেই ভারত থেকে বহু মানুষ অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অনুযায়ী, বর্তমানে ২.২ লাখ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাস করছে, যদিও পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে এই সংখ্যা ৭ লাখের বেশি হতে পারে।
অভিবাসন ইস্যুতে মোদি ও ট্রাম্পের মিল
মোদি ও ট্রাম্প উভয়েই অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ট্রাম্প যেমন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের দোষারোপ করেন, তেমনি মোদির সরকার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের "অনুপ্রবেশকারী" হিসেবে চিহ্নিত করে।
বিজেপির শীর্ষ নেতারা বারবার দাবি করেছেন যে ভারতে ৪-৫ কোটি "অবৈধ" বাংলাদেশি বসবাস করছে, যদিও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০১৯ সালে বলেছিলেন, "আমরা অনুপ্রবেশকারীদের একে একে চিহ্নিত করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেব।"
বিজেপি নেতারা অভিবাসীদের "উপদ্রব" ও "ঘুণপোকা" বলে অভিহিত করেছেন।
অভিবাসনবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে ভারত সরকার ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) প্রণয়ন করে, যা মুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ধরপাকড় ও গণগ্রেপ্তার চালানো হচ্ছে।
মোদি এবং ট্রাম্প উভয়ই অভিবাসন ইস্যুকে জাতীয়তাবাদী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের বিতাড়নের ক্ষেত্রে মোদির নীরবতা প্রমাণ করে যে তিনি শুধু "হিন্দু ভারত" ধারণার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগ্রহী, কিন্তু বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে নয়।
এই নীতির ফলে ভারতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে দেশের ভেতরেই সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
লেখক: সোমদীপ সেন, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, রসকিল্ড ইউনিভার্সিটি
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা নিউজ