Logo
×

Follow Us

মতামত

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. মো. নুরুল ইসলাম

বিদেশগামী কর্মীদের ট্রেনিং যুগোপযোগী হচ্ছে না

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১৩:০০

বিদেশগামী কর্মীদের ট্রেনিং যুগোপযোগী হচ্ছে না

(ড. মো. নুরুল ইসলাম বিএমইটির সাবেক ডিরেক্টর। অভিবাসন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণ বিষয়ে তার রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প টিভিইটি স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। কাজ করেছেন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসেও। জনশক্তি রপ্তানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকার ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ নিয়ে কর্মকাণ্ড বিষয়ে দীর্ঘ মতামত দিয়েছেন মাইগ্রেশন কনসার্নকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব স্মারক।) আজ থাকছে ১ম পর্ব।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : ড. নুরুল ইসলাম আপনাকে স্বাগত। আপনি দীর্ঘ সময় সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানে থেকে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি কীভাবে পাঠানো যায়, তা নিয়ে কাজ করেছেন। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা না বাড়ালে বিদেশে গিয়ে খুব বেশি লাভ নেই। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি- এই বিষয়টির মধ্যে ‘দক্ষতা’র গুরুত্ব কতটা?

ড. মো. নুরুল ইসলাম : যারা আমাদের দেশ থেকে বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ। যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অদক্ষ বলা হয় না, আমরা বলি ‘স্বল্প দক্ষ’। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এদের কোনো দক্ষতা নেই। এরা যাচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের ‘ওয়ার্কার’ হিসেবে, ‘লেবারার’ হিসেবে কিংবা ‘হেল্পার’ হিসেবে। তারা রেমিট্যান্স পাঠান কম, তাদের বেতন কম কিন্তু সমস্যা সব থেকে বেশি! প্রবাসীদের নিয়ে আমরা যত সমস্যার মুখোমুখি হই, সবচেয়ে বেশি সমস্যা কিন্তু এদের। সুতরাং, আমরা যদি আমাদের দেশে রেমিট্যানন্স এর পরিমাণ বাড়াতে চাই, তাদের কাজের মান যদি বাড়াতে চাই, আমরা যদি চাই তারা গিয়ে উন্নত পরিবেশে কাজ করবেন, তাহলে আমাদের দক্ষ কর্মী পাঠাতেই হবে। আর দক্ষ কর্মী পাঠাতে হলে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের পাঠাতে হবে।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : যথাযথ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

ড. মো. নুরুল ইসলাম : দেখুন, বিদেশে কাজের চাহিদা, বিভিন্ন দেশের কাজের ধারা অনুযায়ী চাহিদা বিচার করে আমাদের প্রশিক্ষণটা দিতে হবে। দক্ষ করে তাদের পাঠাতে হবে। এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গত প্রায় ৫০ বছর ধরে বিদেশে লোক পাঠাচ্ছি, কিন্তু আমরা এখনো সেই আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। এখনো আমাদের প্রবাসে যাবার একটি বড় অংশ হলো অদক্ষ। একইভাবে দক্ষ কর্মী পাঠাবার যে লক্ষ্যমাত্রা আমরা বিভিন্ন সময়ে নির্ধারণ করেছি, সেগুলোও আমরা অর্জন করতে পারিনি। এটি আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : দক্ষ কর্মী পাঠানোর যে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা কেন সেটি এখনো পূরণ হয়নি? বাংলাদেশ সরকার যেভাবে দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, সেই উদ্যোগ কি যথেষ্ট?

ড. মো. নুরুল ইসলাম : এর অনেক কারণ রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমাদের দক্ষ করে পাঠাতে হবে। প্রথম কাজটা হলো চাহিদা নিরূপণ করা। যাকে আমরা টিএনএ বলি, অর্থাৎ ট্রেনিং নিড এসেসমেন্ট। অন্য দেশের দক্ষ কর্মীর চাহিদা বুঝতে হলে একটা সার্ভে বা জরিপ করতে হয়, স্টাডি করার প্রয়োজন- যেটি আমাদের দেশে কখনোই সেভাবে হয়নি। একটা স্টাডি আমরা বড় আকারে করেছিলাম জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটির মাধ্যমে ২০১৮ সালে। সেই সময়ে কোন কোন দেশে কী ধরনের কর্মীর বা কাজের ডিমান্ড বা চাহিদা আছে তা বোঝার জন্য এই কাজটি আসলে সব সময় করে যেতে হবে।

মাইগ্রেশন কনসার্ন : বিদেশে কাজ বা কর্মীর ডিম‍ান্ড জানা-বোঝা বা এসেসমেন্ট করাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন?  

ড. মো. নুরুল ইসলাম : কারণটা হলো কী, দেশে দেশে কাজের ডিমান্ড বা চাহিদা পরিবর্তন হয়ে যায়। উন্নত দেশগুলোতে নতুন নতুন প্রজেক্ট আসে, নতুন পরিকল্পনা থাকে। বিশেষ করে নতুন ধরনের কন্সট্রাকশন প্রজেক্ট বা নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার জন্যে চাহিদা তৈরি হয়। অনেক সময় বিদেশে নতুন শহর তৈরির পরিকল্পনা থাকে। সে ধরনের কাজের জন্য যে ধরনের লোকের প্রয়োজন, তার একটা চাহিদাপত্র বিশ্বের এলাকা ভাগ করে করা যেতে পারে। দেখা গেছে এক ধরনের কাজের জন্য ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, প্রাচ্য থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত, মানে সারা বিশ্বেই এ রকম চাহিদা থাকে- সেই চাহিদার তালিকা তৈরি করা দরকার। যা আমরা আসলে করি না। এটি আমাদের প্রথম প্রয়োজন।

দ্বিতীয় হলো, বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করার জন্য আমাদের দেশে যে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাটি রয়েছে, তাকে ঢেলে সাজাতে হবে। চাহিদার সাপেক্ষে যে পরিবর্তন- এটি আমাদের কখনো করা হয় না। বিদেশে লোক পাঠানোর জন্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের বিএমইটির মতো বড় প্রতিষ্ঠানে। সেখানে এখন ১১০টির মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু ‘টার্গেটেড ট্রেনিং’ অর্থাৎ বিদেশের বর্তমান চাহিদা বিবেচনা করে যে প্রশিক্ষণ দেয়া, সেটি কিন্তু হচ্ছে না। যেটি হচ্ছে তাকে বলা যায় ‘জেনেরিক ন্যাচার’। মানে এখানে আমরা ট্রেনিং দেব, তারপর আমরা তাদের পাঠাবো। কিন্তু সেই ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে ‘ম্যাচ’ করল কিনা, তা কিন্তু আমরা পরীক্ষা করে দেখছি না। যেটা আসলে বেশি দরকার।

আর তৃতীয়ত, এই দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যে প্রশিক্ষণগুলো আমাদের এখানে আছে, তার জন্য আমাদের যেসব প্রয়োজনীয় বিষয়; যেমন: উপযুক্ত প্রশিক্ষক আছে কিনা, তাদের প্রশিক্ষণের দরকার আছে কিনা সেগুলো পর্যালোচনা করা খুব জরুরি। কেননা প্রশিক্ষকের ট্রেনিং না হলে তো প্রশিক্ষণটা ভালো হবে না। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি আছে কিনা, সেটিও জানা দরকার। কেননা যে দেশে লোক পাঠাচ্ছি, সে দেশের উপযোগী যন্ত্রপাতিতে যদি আমরা প্রশিক্ষণটা না দিই, তাহলে তো তাদের সেখানে পাঠিয়ে খুব ভালো কিছু হবে না। সে গিয়ে কাজ করতে পারবে না। কাজেই বিভিন্ন সেক্টরে যে আধুনিক যন্ত্রপাতি দরকার, সেগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আজকের ব্যবহৃত মেশিন হয়তো ৫ বছর পরে আর ব্যবহার হবে না। সেই অনুযায়ী আমাদের ট্রেনিং সেন্টারগুলোর ‘ইকুইপমেন্ট আপগ্রেডেশনে’র বড় পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেটি সরকারি এবং বেসরকারি সবখানেই। এটা আমাদের একটি বড় সমস্যা।

আর চূড়ান্তভাবে যদি দেখি, আমাদের সাথে ‘ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ’ এর অভাব থেকে যায়। যেমন ধরুন ট্রেনিং কেন্দ্র মানে যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আর যেখানে কাজ করে- তার মধ্যে একটি বড় ‘গ্যাপ’ থেকে যায়। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই! মানে প্রশিক্ষণটা হয়ে যায় ‘একাডেমিক’, ‘ইন্ডাস্ট্রি বেইজড’ না। এ জন্য ‘ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ’ এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটা সংযোগ স্থাপন করা দরকার। এই ৪টি বিষয় যদি আমরা বিবেচনা করে চলতে পারি, তাহলে বিদেশে দক্ষ লোক পাঠানোর লক্ষ্য আমরা সাফল্যের সাথে অর্জন করতে পারব। এটি ফিলিপাইনে খুব ভালোভাবে করে। ভারতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা করা হয়। তাই বাংলাদেশেও এটা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেশন কনসার্ন: যেটি বললেন, বেশ কয়েকটি ধাপে দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়টি সহজ এবং সফল হয়, সে ক্ষেত্রে এটি আসলে কেন করা হচ্ছে না? এটি কি আমাদের ক্যাপাসিটি বা সামর্থ্যের অভাব নাকি বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্তের সমস্যা?

ড. মো. নুরুল ইসলাম : আমিতো মনে করি এটি নীতিগত সমস্যা। এখানে যারা এই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, অর্থাৎ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বা অন্যান্য যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তাদের কেউই এই বিষয়টিকে ‘প্রিন্সিপালি’ ধারণ করতে পারছে না। আমাদের কী কী করতে হবে এবং কীভাবে এগোতে হবে- এই ব্যাপারগুলো সঠিকভাবে নির্ধারণ ও পরিচালনা হচ্ছে না। এই ব্যাপারগুলো কিন্তু খুব কঠিন নয়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে সেই অনুযায়ী যদি কর্মকৌশল নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া যায়, আমাদের পলিসি সেভাবে নির্ধারণ করে যদি এ্যাকশন প্ল্যানকে সেভাবে ঢেলে সাজানো যায়; তাহলে এটি খুবই সম্ভব। কিন্তু যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন, তারা যথাযথভাবে করতে পারছেন কিনা, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে।

চলবে…

Logo