চীনে যাওয়ার আগে
ভাষা প্রযুক্তি অ্যাপ নিন ফোনে

ফোরকান আলম
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৫, ১৬:৪১

পড়ালেখা, ব্যবসা বা ভ্রমণ যেটাই হোক না কেন; প্রথমবার চীনে গিয়ে আপনাকে বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তবে কিছু জিনিসের প্রতি খেয়াল রাখলে চীনের দিনগুলো আপনার জন্য হয়ে উঠতে পারে আরো উপভোগ্য। আপনার মোবাইলটিতে থাকা কয়েকটি অ্যাপ চীন সফরকে আরো সহজ ও আনন্দপূর্ণ করে তুলবে এবং এই অ্যাপগুলো সম্পর্কে যদি আপনার একেবারেই কোনো ধারণা না থাকে, তবে আপনার জন্য চীন ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ।
সারাবিশ্ব থেকে প্রতিবছর ছাত্ররা যেভাবে উচ্চ শিক্ষার জন্য চীনে পাড়ি জমাচ্ছে, তেমনি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রতিবছর লাখ লাখ বিদেশির গন্তব্য চীনের গোয়াংজু, সাংহাই, শেনজেনসহ প্রধান শহরগুলো। হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ভ্রমণবান্ধব পরিবেশের জন্য পর্যটকদের কাছে চীন হয়ে উঠছে ভ্রমণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। অপেক্ষাকৃত কম খরচ হওয়ায় চীনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে ভ্রমণপিপাসুদের। তবে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। ব্যবসার ফাঁকে চীনের প্রাচীন শহর ও স্থাপনাগুলো দেখা অনেকটা রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচার মতো। ব্যবসার কাজে গেলেও চীনের অলিগলিতে একটু পা ফেলে আসার চেষ্টা সবারই থাকে।
চীনে যে জন্যই যান না কেন, কিছু সমস্যায় প্রায় সবাইকে পড়তে হয়। আধুনিক চীনে প্রায় সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর। আপনি যদি আগে থেকে একটু সতর্ক না হন, তবে সামান্য কেনাকাটা করতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে পারেন। বর্তমান চীনে কাগজের টাকা বা মুদ্রার ব্যবহার নেই বললেই চলে। আবার ভাষাগত সমস্যার কারণে আপনি বেশ বড় গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন। এ রকম সমস্যাগুলো এড়াতে আপনি যদি ভ্রমণের আগে একটু সচেতন হন, তবে চীন ভ্রমণ আরো সুখকর হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে এই অ্যাপগুলো আপনাকে চীন ভ্রমণে নানাভাবে সাহায্য করবে।
১. ট্রান্সলেটর :
বিমান থেকে নামার পর প্রথমেই আপনাকে যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হবে, সেটি হলো চায়নিজ ভাষা। চীনের বিমানবন্দরগুলোতেও ইংরেজির ব্যবহার নেই বললেই চলে। কারো কাছে কোনোকিছুর জন্য সাহায্য চাইবেন সেটাও কষ্টসাধ্য। কেউই আপনার ভাষা বুঝবে না। সে আপনি ইংলিশ বা বাংলা যাই বলুন না কেন।
ট্যাক্সি, ইন্টারনেট কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো তথ্যের জন্য কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলেও আপনাকে কিছুটা হতাশ হতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপনার হাতে যদি একটি ট্রান্সলেটর অ্যাপ থাকে, তবে এই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রেও একটি বিষয় জানা জরুরি, তা হলো গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার না করা।
চীনে গুগলের সার্ভিস নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহার করেও গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করা যায় না। এ জন্য বাইদু (Baidu) কিংবা মাইক্রোসফট ট্রান্সলেটর ব্যবহার করা সুবিধাজনক। এয়ারপোর্টের ইন্টারনেট ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে সকল কাজ মোবাইলে থাকা ট্রান্সলেটর অ্যাপ ব্যবহার করে চায়নিজদের সহযোগিতা নিতে পারবেন। আইফোন ইউজাররা চাইলে অ্যাপল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে চায়নিজদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারবেন।
২. ভিপিএন :
কোথাও যাওয়ার পর আমরা প্রথমেই চাই পরিবার ও কাছের মানুষগুলোকে পৌঁছানোর খবরটুকু জানাতে। দেশে যেমন সবাই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা গুগলের সার্ভিসগুলোর সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু চীনে এগুলো ব্যবহার করা যায় না। আপনি যদি এয়ারপোর্ট ওয়াইফাই কানেকশন বা সিম কিনে ইন্টারনেট পেয়েও যান, তাও আপনি এগুলো ব্যবহার করতে পারবেন না। এসব সার্ভিস ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই একটি ভালো মানের ভিপিএন ব্যবহার করতে হবে।
ফ্রি ভিপিএনগুলো চীনে কার্যকরী নয়। খুব ভালো হয়– চীনে আসার পূর্বেই যদি দেশে বসে একটি পেইড ভিপিএন ক্রয় করে আসতে পারেন। একটি ভিপিএন থাকলে আপনি সব যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবেন। পরিবারসহ সারাবিশ্বের সঙ্গে কানেক্টেড থাকতে তখন আর বেগ পেতে হবে না।
৩. উইচ্যাট :
চীনে আসার পর আপনি যদি কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান, তবে আপনাকে বেশ বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। আপনি যদি কোনো ব্যক্তির ফোন নম্বর মোবাইলে সেইভ করে নেন, তাও ভাষাগত সমস্যার কারণে পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ করতে পারবেন না।
আমরা যেমন টুক করে হোয়াসটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারগুলোতে মেসেজ পাঠাতে পারি, সেই সুযোগও নেই। সে ক্ষেত্রে আপনি যদি ভ্রমণের আগেই একটি উইচ্যাট (WeChat) অ্যাকাউন্ট খুলে আসতে পারেন, সেটা আপনাকে নানাভাবে সাহায্য করবে।
উইচ্যাটকে বলা হয় সুপার অ্যাপ। অর্থাৎ এই অ্যাপ দিয়ে ইন্টারনেট বিষয়ক সব কাজ করা যায়। সদ্য পরিচিত হওয়া নতুন বন্ধুকে যেমন খুব দ্রুতই আপনার উইচ্যাটে যুক্ত করে ফেলতে পারবেন, তেমনি ভাষাগত সমস্যার কারণে কথা বলতেও বাধাগুলো আর থাকবে না।
উইচ্যাট অ্যাপের মধ্যেই থাকা অটোমেটিক ট্রান্সলেটর আপনার যোগাযোগ আরো সহজ করে দেবে। ফলে আপনি ইংলিশ লিখলেও সে চায়নিজে সেটা দেখতে পাবে এবং সে চায়নিজে লিখলে আপনি তা ইংলিশে দেখতে পাবেন। সেজন্য বারবার আলাদা ট্রান্সলেটর ব্যবহার করতে হবে না। চীনে প্রবেশ করার পর সর্বত্রই উইচ্যাটের ব্যবহার চোখে পড়বে। ট্যাক্সি অর্ডার থেকে শুরু করে দোকানে কেনাকাটার পর টাকা দেওয়ার জন্যও উইচ্যাট ব্যবহার করা হয়। এক অ্যাপ দিয়ে সব করা যায় বলে উইচ্যাটকে চীনের জাতীয় অ্যাপ বললেও ভুল হবে না। তাই চীনে পা রাখার পর উইচ্যাট হতে পারে আপনার জন্য মুশকিল আহসান।
৪. আলি পে :
চীনের কেনাকাটা বা লেনদেনের জন্য কাগজের নোটের প্রচলন নেই বললেই চলে। কোনো সবজি ভ্যান থেকে সবজি কেনার জন্য হলেও আপনাকে মোবাইল দিয়ে পে করতে হবে। একজন ভিক্ষুকও মোবাইলের মাধ্যমে দান গ্রহণ করেন।
অনেক সময় কাগজের টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভাংতি দিতে গিয়ে দোকানিরা বিপদে পড়েন। আজকাল অনেকে কাগজের নোট দেখলেও বিরক্তি ভাব প্রকাশ করে। এই ঝামেলা থেকে রক্ষা পেতে আলি পে(Ali Pay) নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করলে কোথাও আর সমস্যায় পড়তে হবে না।
চায়নাতে পেমেন্টের জন্য উইচ্যাট ও আলি পে বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। দেশের সর্বত্র এই অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। উইচ্যাটে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক কার্ড দিয়ে পে করায় রেসট্রিকশান আছে। এক্ষেত্রে উইচ্যাট ব্যবহার না করাই ভালো। বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার চায়নাতে আসবেন। বরং এক্ষেত্রে আলি পে ব্যবহার করাই ভালো। তাছাড়া, আলি পের ইন্টারন্যাশনাল ভার্সনটিতে সহজেই আপনার ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড যুক্ত করে চায়নার যে কোনো জায়গায় পে করতে পারবেন। মেট্রো বা বাসের মতো পাবলিক সার্ভিসগুলো ব্যবহার করতে তখন আর কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। পাবলিক সার্ভিসগুলো ব্যবহার করতে পারলে আপনার ভ্রমণ খরচেন বড় একটা অংশ বাঁচাতে পারবেন। তাই চীনে পা রাখার পূর্বে অবশ্যই একটি আলী পে অ্যাকাউন্ট খুলে আসুন।
৫. চীনের কোথাও যেতে হলে অবশ্যই আপনাকে লোকেশনগুলো জানতে হবে। কিন্তু ঠিকানা চাইনিজে লেখার কারণে আপনি কিছুই বুঝতে পারবেন না। তাছাড়া গুগল ম্যাপও এখানে কাজ করে না। তাই কোনো জায়গা খুঁজে পেতে আপনাকে খানিকটা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। যদিও ট্যাক্সি ড্রাইভারদেরকে চাইনিজ ঠিকানা দেখালে তারা আপনাকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যাবে। কিন্তু আপনার হাতে যদি একটি ম্যাপ থাকে তবে আপনার ভ্রমণ আরো সহজ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে অ্যাপ স্টোর থেকে বাইদু(Baidu) ম্যাপটি ডাউনলোড করে রাখলে ভ্রমণে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। অ্যাপল ইউজার জন্য অ্যাপল ম্যাপ আরো ভালো কাজ করে। সাথে সবকিছু ইংলিশে থাকায় চীনের ভ্রমণ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
ফোরকান আলম, শিক্ষার্থী
শিদিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, শিয়ান, চীন