অস্ট্রেলিয়ার চিঠি, পর্ব-১
সিডনিতে নতুন জীবন শুরু…
সাইফুদ্দিন অপু, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫, ১৮:৩৯

১০ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, ২০১৩। আলো ঝলমলে সকাল। বিমানবন্দরে আমার ছোটবোন তার মেয়েদের নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। কিংসফোর্ড স্মিথ বিমানবন্দরে নেমে আমার যে অনুভূতিটা হয়েছিল- যাক এসে গেছি, সামনে বিস্তৃত মাঠই আমার। একটা নতুন স্বপ্নের শুরু হবে আজ থেকে।
আমার মনে আছে, সেদিন আমাদের ট্যাক্সিচালক ছিলেন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের এক ভদ্রলোক। আমিও খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে হিন্দিতে কথা বলছিলাম। তাকে বলছিলাম, আমি প্রায় ৯ বছর তিনটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছি বাংলাদেশে। সে এক ভিন্ন অনুভূতি। যাক স্বপ্নের দেশে পৌঁছে গেছি। এখন বাকি সব আমার।
প্রথম দিন বাসায় এসে খেলাম। আমার বোনকে বললাম, একটু হাঁটতে বের হই চলো।দেখে আসি সিডনি নগরীটা দেখতে কেমন? সে বলল, ভাইয়া এখানে বাংলাদেশের মতো যখন- তখন রাস্তা পার হওয়া যায় না। সিগন্যাল বাতি আছে, সবুজ বাতি জ্বললে ওখানে একটা লোক আসবে, তখন আপনি রাস্তা পার হতে পারবেন। আমি ওর কথা মতো সিগন্যালের সামনে বাটন চেপে ওই লোকের জন্য অপেক্ষা করছি, কিন্তু কোনো লোক আসে না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কাউকে না দেখতে পেয়ে নিজে নিজেই রাস্তা পার হয়ে গেলাম।
বাসায় ফিরে বোনকে বললাম, সিগন্যালে তো কোনো লোক এলো না! বোন আমার হাসতে হাসতে শেষ! পরে সে বুঝিয়ে বলল… রাস্তা পার হওয়ার জন্য সিগন্যালের লাইটে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে ওই ধরনের সাইন এলেই রাস্তা পার হতে হয়। আমি বেকুব বনে গেলাম! বাঙালের সিডনি শহরের প্রথম পাঠ সেদিনই শুরু। রাস্তা পার হওয়ার জন্য সিগন্যালের লাইটে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে ওই ধরনের সাইন এলেই রাস্তা পার হতে হয়। আমি বেকুব বনে গেলাম! বাঙালের সিডনি শহরের প্রথম পাঠ সেদিনই শুরু।
রাস্তায় বের হলাম বিদেশ দেখব বলে। একটু হেঁটে দেখি বাংলায় লেখা- ”সাউথইস্ট ব্যাংক মানি ট্রান্সফার”… এখান থেকে সহজে দেশে টাকা পাঠানো যায়। আরো একটু হেঁটে দেখি লোকজন বাংলায় কথা বলে, পান খায়, সিগারেট খায়, হেঁটে বেড়ায়। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এত সাধের "সিডনি" দেখি আমার চট্টগ্রামের জিইসির মোড়ের মতো লাগে!
প্রথম কয় দিন ভালোই কেটেছে। বলা যায় সপ্তাহখানেক। রাস্তায় যে কোনো বিদেশি কারণ ছাড়াই "হাই" বলে। মনে মনে বলি আহা... কি ভদ্র এরা। এরপর থেকে আমিও সবাইকে "হাই" বলছি। একপর্যায়ে রাস্তায় মালিকদের সঙ্গে হাঁটা কুকুরকেও ‘হাই’ বলছি। নিজেকে ভদ্রতা শেখাচ্ছিলাম। কুকুরকে "হাই" বলাতে খেয়াল করলাম কুকুরওয়ালা/ওয়ালির চেহারা একরকম ঝলমলে হয়ে যায়। ওরা নিজের থেকেই যেচে কথা বলে। আমি এ সুযোগটা নিলাম। বেছে বেছে সুন্দরী কুকুরওয়ালিদের কুকুরকে "হাই" বলতাম। ওরা খুশি হয়ে কথা জুড়ে দিকে কুকুর বিষয়ক আলাপ। সমস্যা যেটা হতো, আমি তো কুকুর বিষয়ক কিছুই জানি না, তাই ওরা আমাকে যাই জিজ্ঞাসা করত তার বেশির ভাগই মাথার উপর দিয়ে যেতো।
আসলে আমরা যে সমাজে বেড়ে উঠেছি, সে সমাজে মানুষের "মানুষ" হিসেবে বেড়ে ওঠাটাই অনেক কষ্টসাধ্য, কুকুর চেনার সময় কোথায় আমাদের?
সপ্তাহখানেক ভালোই কাটলো। খাই, ঘুরি আর ঘুমাই। এক সপ্তাহ পর অনুভব করলাম বাস্তবতা ভিন্ন। সংসার আছে আমার, দেশে-বিদেশে। দুটি পরিবারের হাল আমাকেই ধরতে হবে। ঘোর থেকে বের হতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে। কাজ পেতে হবে। যে কোনো কাজ।
চলবে...