অস্ট্রেলিয়ার চিঠি, পর্ব-৩
ক্যারিয়ারে এলো টার্নিং পয়েন্ট…
সাইফুদ্দিন অপু, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫, ১৯:০৮

দুদিন বাদেই একটা জব পেলাম। আমাদের বাংলাদেশিদের ভাষায় ‘অড’ জব। যদিও এ দেশের লোকজন কোনো জবকেই ‘অড’ মনে করে না। জব মানে কাজ, মানে জীবিকা। আমার জব ছিল সাতটা ফ্লোরে অফিস বিন পরিষ্কার করা। চার ঘণ্টার জব। প্রথম কদিন ভালো লাগছিল। হালকা কাজ। ছোট ছোট বিন চেক করে ময়লা ফেলে নতুন বিন ব্যাগ দেয়া। কদিন বাদে খেয়াল করলাম কাজটা প্যারার।
এ দেশে সপ্তাহান্তে কিংবা ১৫ দিনে বেতন দেয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ হলো টাকা আসে না। সে কি যন্ত্রণার। দেশ থেকে মাত্র এসেছি। হাতে টাকা নেই। একদিন লজ্জা রেখে ম্যানেজারকে বললাম টাকা পাইনি। ম্যানেজার বললেন, পরের সপ্তাহে পাবে। তুমি নতুন তাই দু্ই সপ্তাহ ট্রেনিং করিয়েছি। খুব মন খারাপ হলো। দুই সপ্তাহ শুধুই কষ্ট করলাম? পরে জানলাম আমার ওই দুই সপ্তাহের টাকা আমার দেশীয় ম্যানেজার মেরে দিয়েছেন। সে দিন মন থেকে কাউকে অভিশাপ দিয়েছিলাম। আল্লাহ বিচার করবেন।
দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না। হাতের সব টাকা ফুরিয়ে গেছে। কাজ দরকার। চুপচাপ বসে থাকি বাসায়। আমার বউয়ের চেহারার দিকেও তাকানো যাচ্ছে না। ও হন্যে হয়ে কাজ খুঁজেই চলেছে। একদিন হঠাৎ করে বিধাতার আশীর্বাদ নিয়ে এলেন রোজী আপা, আমার বোনের পারিবারিক বন্ধু। রোজী আপা হচ্ছেন যথেষ্ট রকমের স্টাইলিশ মহিলা আর অসম্ভব রকমের গুণী। দেখে মনে হবে তিনি সারাদিন সাজুগুজু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আদতে তিনি সারা সময় মানুষের উপকার করে বেড়ান। তার রান্নার সঙ্গে ওভার মেলাতে গেল যে কেউ কনফিউজড হবে, এই মহিলা এত ভালো রান্না করে?
একদিন বিকেলে এসে বললেন, আপনার জন্য একটা জব পেয়েছি। কাল সকাল ৫টায় ইকবালের বাসায় যাবেন, ইকবাল নিয়ে যাবে।
ইকবাল; আমার অস্ট্রেলিয়ান ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ইকবাল একটা ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিতে কাজ করত সে সময়। প্রতি বছর ক্রিসমাসের আগে অনেক লোক লাগে। ইকবাল সে সময় আমার কথা বলে রেখেছিলেন ওই কোম্পানির ম্যানেজারকে। সেই ভোরে ইকবালের বাসায় নিচে গিয়ে বসেছিলাম ইকবালের সাথে যাবো বলে। গিয়ে দেখি আরো দু-চারজন বাংলাদেশি একসাথে কাজ করে ওই কোম্পানিতে।
অফিস নিয়ে আমরা যে ধারণা পোষণ করি, ঠিক সে ধারণা নিয়ে গিয়েছিলাম কাজে। একদম অফিস অ্যাটায়ার। গিয়ে একটু লজ্জা পেলাম। সবাই হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ট্রেইলার আনলোড করছে। ম্যানেজার আমাকে বললেন, ওই ট্রাকে গিয়ে আনলোড শুরু করো। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছি ট্রেইলারের ভেতরে। এক একটা ফ্রেইট আমার চাইতে বড়। আমি নাড়াতেই পারি না, তার উপরে আমি ফরমাল কাপড়ে। এই কাপড়ে তো আর বাক্স তোলা যায় না!
আমি সেদিন কেঁদেছিলাম, মনের অজান্তে। আমি তো অনেক স্বপ্ন নিয়ে এ দেশে এসেছি, কী করছি আমি?
চলবে…