সুইডেন থেকে অনন্য নন্দিতা, পর্ব ১
গন্তব্য সুইডেনের লুন্ড শহর, সাথে আমার দুই কন্যা শিশু

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৫:৩৯

অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন।
ইউরোপে আসার স্বপ্নের শুরু ইউনিভার্সিটিতে ফরাসী ভাষা শেখার শুরু থেকে । বিদেশী ভাষা শেখার প্রতি আমার আগ্রহ দুর্নিবার । আর মিডিয়া এ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগে স্নাতক করতে গিয়ে, ফরাসি ভাষাটা বাধ্যতামুলকভাবেই নিতে হয়েছিলো। খুব দক্ষতার সাথেই আয়ত্ব করেছিলাম ভাষাটি। এমনকি সেই ভাষায় একটা কবিতা লিখে চমকে দিয়েছিলাম ফরাসী শিক্ষককে । তিনি ভাবতেন একদিন হয়তো আমি ফ্রান্সেই পাড়ি জমাবো। কিন্তু সংসার, বাচ্চা আর চাকরী সামলাতে গিয়ে, আরো আট-দশটা মেয়ের মতো আমার স্বপ্নগুলোও খাঁচায় বন্দি রয়ে গেলো!
যতদিনে সেই প্রাচীর পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে আসার চেষ্টায় নামলাম, ততদিনে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পরম বন্ধু সুইডেনে তাদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। তাদের একজনের সাথে আমার সুইডেনে আসার ব্যাপারে কথা হলো।সে আমাকে বললো ইংরেজি ভাষাভাষী কোনো দেশে চেষ্টা করতে। ইউরোপের স্বতন্ত্র ভাষার দেশগুলোর কোনোটাতেই আমার জীবনটা গুছিয়ে নেয়া সহজ হবেনা। আমার নিজের দেশে কি কারো জীবন সহজেই কেটে যায়? জীবন মানেই যুদ্ধ , কিন্তু সেই যুদ্ধের বিনিময়ে আমি যদি আমার সন্তানদের একটা নিরাপদ আর নিশ্চিত ভবিষ্যত উপহার দিতে পারি, তাহলে কি, মা হিসেবে একটা কঠিন জীবনের ঝুঁকি আমার নেয়া উচিত নয়?
সেই থেকে আমার চেষ্টার শুরু। সুইডেনে আসার প্রক্রিয়াটা শুরু করা শিক্ষিত আর কম্পিউটারে মোটামুটি দক্ষ একজন মানুষের জন্য খুব জটিল কিছু নয়। প্রযুক্তির আশির্বাদে অনলাইনে বসে বসে হায়- হ্যালো বলার মতো ভাষাটাও আয়ত্ব করে নিয়েছিলাম। অবশেষে সুইডেনের এক নম্বর ও বিশ্বের একশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় থাকা “Lund University“ তে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছিলাম শুধুমাত্র প্রযুক্তির সহযেগিতা নিয়েই। ২০১৬ সালের নভেম্বরে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমালাম স্বপ্নের ইউরোপে।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টের লিফ্ট দিয়ে নেমে ধরলাম লুন্ডে আসার সরাসরি ট্রেন।ট্রেনে ঢুকে আমরা তো অবাক। লাগেজধারী যাত্রীদের বসার জন্য আছে নির্দিষ্ট স্থান । নভেম্বর মাস, তাই খুব একটা ভিড়ও নেই।তাই আমাদের অগনিত লাগেজ আর বক্স নিয়ে বেশ আরাম করে বসে গেলাম । ট্রেন কয়েক মিনিট চলতেই ঢুকে গেলো অন্ধকার গুহায়, ভয়ে গায়ের ভেতর কেমন যেনো শিউরে উঠেছিলো ! যদিও জানতাম সাগরের কয়েকশ ফুট নীচ দিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার ছুটবে ট্রেনটি। যখন টানেল থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এলো, আমাদের সবার দৃষ্টি তখন জানালার বাইরে । সাগরের মাঝ দিয়ে ছুটে চলছে আমাদের ট্রেন । আহা কি অপরুপ সেই দৃশ্য ! মনে হচ্ছিলো যেনো স্বর্গের দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করলাম। ডেনমার্ক থেকে সুইডেনের দক্ষিণে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় শহর হিসেবে খ্যাত “ লুন্ড” এ পৌছাতে সময় লাগলো মাত্র ৪০ মিনিট।
লুন্ডে নামার সাথে সাথেই অনুভব করলাম স্বর্গের তাপমাত্রাটা একটু বেশিই শীতল। আমার বন্ধু ট্রেন স্টেশনেই অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্য। হাতে তার অতিরিক্ত জ্যাকেট, তার সব কয়টা আমাদের হাতে দিয়ে বললো , “ জলদি পরে নে এগুলো, জানতাম আমার কথা তোরা বুঝবিনা”। আমি শুধু বিড় বিড় করে বললাম এখনতো অটাম, বরফ পড়ছেনা। আমরা আসলেই বুঝিনি । বঙ্গবাজার আর ধানমন্ডি হকার্স থেকে শীতের জন্য জ্যাকেট কিনে এনেছি সত্যিই কিন্তু এখনই যে লাগবে তা জানা ছিলোনা। তীব্র বাতাস, বৃষ্টি নেই , তাও যেনো মনে হচ্ছিলো কেউ আমাদের ফ্রিজের ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে নামিয়ে দিয়েছে। ওর দেয়া জ্যাকেট পরে কিছুটা আরাম বোধ করলাম । ২/৩ মিনিট হেঁটে যেতেই বাস স্টপ। পাশেই ডিজিটাল বোর্ডে সময়সূচি দেয়া আছে।একটা সিট দেখিয়ে আমার বন্ধু বললো- নে এখানে বস, ১০ মিনিটের মধ্যে বাস আসবে। আমি ভাবছিলাম, বসবো?! বাচ্চাকাচ্চা আর লাগেজ নিয়ে চাপাচাপি করেতো উঠতেই পারবোনা।ঠিক সময়মতো বাস এলো, সামনে, মাঝখানে আর পেছনে তিনটা দরজাই খুলে দিলেন বাসচালক।আমার বন্ধু আমার হাতে কয়েকটা টিকেট দিয়ে বললো তুই সামনের দরজা দিয়ে উঠে চালককে এগুলো দেখা, আমি মাঝখানের দরজা দিয়ে লাগেজ তুলছি । আমরা মেয়েরাতো অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো, আর হয়তো ভাবছিলো এই প্রথম তাদের মাকে দুই সন্তান নিয়ে বাসে চড়তে ধাক্কাধাক্কি খেতে হয়নি….
অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন। দেশে তিনি একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র নিউজরুম এডিটর ও নিউজ কাস্টার হিসেবে কাজ করতেন।