Logo
×

Follow Us

প্রবাসীর ডায়রি

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক বাংলা ভাষা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৫, ০০:০৩

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক বাংলা ভাষা

রেশমের কোমল স্পর্শ, পহেলা বৈশাখের প্রভাতে সদ্য তৈরি পিঠার মোহময় সুবাস, রবীন্দ্রনাথের কবিতার সুরেলা ধ্বনি— এর সবকিছু মিলে আমাদের বাঙালিয়ানা এক অপূর্ব, বর্ণিল গাথা। আমরা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অনাবাসী বাংলাদেশিরা, আমাদের এই মহামূল্যবান ঐতিহ্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা আমাদের সন্তানদের কাছে বাংলা ভাষা টিকিয়ে রাখার বাস্তবতা এক কঠিন এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ লড়াই।

আমাদের সন্তানরা তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে প্রতিনিয়ত এমন ভাষার স্রোতে ভাসছে, যা আমাদের মাতৃভাষার মৃদু, সংবেদনশীল শব্দগুলোকে ঢেকে দিতে চায়। স্কুল, খেলার মাঠ, টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব তাদের শেখানো ভাষার তালিকায় বাংলাকে এক প্রাচীন, অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা অনেক গভীর। উপযোগী, আকর্ষণীয় শিক্ষামূলক উপকরণের অভাব আমাদের দিশেহারা করে তোলে। অধিকাংশ দেশে কমিউনিটি কেন্দ্র বা সপ্তাহান্তের বাংলা স্কুলের অভাবের কারণে আমরা নিজেরাই শিক্ষকের ভূমিকা নিতে বাধ্য হই। আমাদের সন্তানদের কাছে বাংলা শেখাকে আকর্ষণীয় করে তোলা আরো কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ তাদের চারপাশের বাস্তবতায় এর সরাসরি প্রয়োজন নেই। উপরন্তু, ব্যস্ত জীবনযাত্রার চাপে আমরা নিজেরাই অনেক সময় বাংলা শেখানোর প্রয়াসে পিছিয়ে পড়ি।

তবু আমরা নিরাশ হবো না। প্রতিটি বাধাকে আমরা সম্ভাবনার সিঁড়ি বানাতে পারি। আমাদের ঘর হতে পারে বাংলার এক আশ্রয়স্থল, যেখানে এই ভাষা শুধুই অতীতের স্মৃতি নয়, বরং একটি প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা। ঘরে বাংলা গানের সুর বাজুক, বাংলা সিনেমার গল্প ফুটে উঠুক এবং প্রতিদিনের আলাপচারিতায় আমাদের মাতৃভাষার মাধুর্য প্রতিফলিত হোক।

আমাদের প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে— ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ, অনলাইন বাংলা ক্লাস এবং ডিজিটাল রিসোর্স ব্যবহার করে আমাদের সন্তানরা যেন বাংলা শেখাকে এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

তবে কেবল ভাষার জ্ঞান দিলেই হবে না; আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের গল্পের সঙ্গেও তাদের পরিচিত করাতে হবে। তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাথা, আমাদের কবিদের কালজয়ী সৃষ্টি এবং পরিবার থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা গল্পগুলো। পিঠা বানানোর আনন্দ, শাড়ি-পাঞ্জাবির মর্যাদা এবং আমাদের উৎসবগুলোর উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরা তাদের মনে গেথে দিতে পারি বাংলার প্রতি ভালোবাসা।

একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, একটি সমষ্টিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলা ভাষার পাঠচক্র, ভাষার খেলাধুলাভিত্তিক কার্যক্রম এবং ছোট পরিসরে বাংলা বইয়ের বিনিময় ব্যবস্থা করে আমরা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারি। কমিউনিটি সেন্টারে বাংলা ক্লাস চালুর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে এবং দক্ষ ও আগ্রহী শিক্ষকদের খুঁজে বের করে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি কাঠামোগত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সন্তানদের বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা সরাসরি বাংলার প্রাণস্পন্দন অনুভব করতে পারে। তাদের আমাদের মাটির গন্ধ শুঁকতে দিতে হবে, আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনে বাঁধতে হবে এবং বাংলার সংস্কৃতি ও ভাষার বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত হতে দিতে হবে।

এই পথ সহজ নয় এবং এটি অনেক পরিশ্রম ও ধৈর্য দাবি করে। কিন্তু ফলাফল হবে অমূল্য– আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, “নিজ মাতৃভাষায় নিজের কথা প্রকাশ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বড় সম্পদ।” তাই আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, ধৈর্য আর সৃজনশীলতা নিয়ে বাংলা ভাষাকে আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে স্থায়ী করে তুলি।

মুহাম্মাদ মাহমুদুল হক: কানাডা প্রবাসী অভিভাবক

Logo