সুইডেন থেকে অনন্য নন্দিতা, পর্ব- ৪
অবশেষে পেলাম নিজের একটা ঠিকানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৭:৩৪

অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন।
একটা ছাত্রাবাসে দুই মাসের জন্য থাকার ব্যবস্থা হলো। স্প্যানিশ একটা ছাত্রী গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি যাবে, তার রুমটাই ভাড়া দিলো আমাদের। এরপর কি হবে তা অনিশ্চিত, তারপরও মেয়েদের নিয়ে ওঠে গেলাম। আমার মহিলা বস, খুব হৃদয়বান! তাকে খুলে বললাম আমাদের থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যার কথা। তিনি চটজলদি পৌরসভার কার্যালয়ে ফোন দিলেন আর চড়া গলায় বললেন সুইডেনের আইন অনুযায়ী কোনো বাচ্চার একরাত বাসস্থান ছাড়া থাকার নিয়ম নেই। তাই যদি আমি এই দুই মাসের মধ্যে কোনো থাকার ব্যবস্থা করতে না পারি তাহলে কর্তৃপক্ষকে থাকার জায়গা খুঁজে দিতে হবে! অথবা অল্প টাকায় কোনো হোটেল ঠিক করে দিয়ে থাকেন তারা। যাক, এসবকিছুর আর প্রয়োজন হলোনা। একজন ভারতীয় নারীর সহযোগিতায় সাবলেটে একটা রুম মিলে গেলো। সুইডিশ এক ভদ্রলোকের খুব পুরোনো বাড়ি, সিড়ির নীচে ছোট্ট একটা রুম।
একটা টয়লেট, অর্ধেক শরীর কুজো করে কোনো রকমে ঢুকে কমডে বসা যায় আরকি। আর গোসলখানা শেয়ার করতে হতো আরো তিনজনের সাথে। একরুমে এক বাবা থাকেন তার ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে , আরেক রুমে রেস্তোরায় কর্মরত এক ভদ্রলোক । রান্না ঘরও শেয়ারে , মাঝে মাঝে ‘হারাম’ মাংসের তীব্র গন্ধ ছাড়া আর কোনো সমস্যা হচ্ছিলোনা।
বাড়িটা যেমনই হোক, আমার জন্য সৌভাগ্যই বয়ে এনেছিলো। হাউজকিপিং এর কাজটা মন আর শরীরে না ধরলেও, কাজটা দিয়ে স্থায়ীভাবে সুইডেনে বসবাসের চেষ্টায় উঠেপড়ে লাগলাম । ভিনদেশে ৯ মাস পেরিয়ে গেছে ততদিনে স্টুডেন্ট পারমিট থেকে ওয়ার্ক পারমিটে পরিবর্তন করার জন্য বাধ্যতামুলক ৩০ ক্রেডিটের বেশিও সম্পন্ন হয়েছে। তবে, এর জন্য প্রয়োজন একটা স্থায়ী চাকরী। হঠাত করেই হোটেলের ব্রেকফাস্ট ডিপার্টমেন্টের একজন চাকরি ছেড়ে দিলেন। বিধাতা যেনো নিজের হাতে আমার জন্য খুলে দিলেন চ্যালেন্জের দুয়ার । সেই চ্যালেন্জ মোকাবেলা করার সাহসও তিনি আমায় দিয়েছিলেন । তা নাহলে মধ্যরাতে কাজ শুরু করার চাকরীটা আমি হাসিমুখে নিয়ে নিলাম কেমন করে ? এই দেশে টিকে থাকার জন্য আমার কাছে অবশ্য বিকল্প কোনো পথও ছিলোনা।
সাইকেল চালানোর হাতেখরি একাত্তর টেলিভিশনে কর্মরত এক ড্রাইভার ছোটো ভাইয়ের কাছে। কাজের শেষে দুই তিনদিন একটু দেখে নেয়া আর কি। সেই শিক্ষা অবশ্য সুইডেনের জীবনে অনেক বড় কাজে দিয়েছিলো। চাকরীর কনট্রাক্ট সই করার আগেই পুরোনো একটা সাইকেল কিনে নিলাম । তেমন একটা ব্যালেন্স পাইনা, অ্যাপার্টমেন্টের পাশের হাঁটার রাস্তায় একটু একটু করে চালাতে লাগলাম প্রতিদিন। তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ , সুইডেনে আপাতত থাকার ব্যবস্থা আলোর পথ পেলো। ৬ মাসের প্রভিশনাল পিরিয়ড, এরপর চাকরী স্থায়ী হবে । তবে, সেই কনট্রাক্ট পেপার দিয়েই আবেদন করা যাবে সুইডিশ মাইগ্রেশন বোর্ডে ।
চাকরীর প্রথম দিন! দিন বললে অবশ্য ভুল হবে। রাত ৩ টায় ঘুম থেকে ওঠে রেডি হলাম । বিশ্বাস করুন এই লাইনটা লিখতে লিখতে চোখ দিয়ে মনের অজান্তেই জল গড়িয়ে পরছে । ৬ টায় ব্রেকফাস্ট ওপেনের দুইঘন্টা আগে পৌছাতে হবে হোটেলে। ৯ আর ৭ বছরের দুটো মেয়েকে ঘরে রেখে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলাম ৩ টা ২০মিনিটে । অটামের রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার - প্রধান সড়কের আলোগুলো জলছে ।একটা মানুষও দেখা যাচ্ছেনা দৃষ্টির সীমারেখায়। এসময় কোনো বাসও চলেনা। ৫ মিনিট বাড়ির বাইরেই দাড়িয়ে রইলাম।
জীবনের প্রথম এতোরাতে বাইরে একা। যে দেশে আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা— এমন সাহস করতে না পারা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সাইকেল নিয়ে ছোটলাম, লুন্ড এর সেন্ট্রাল সংলগ্ন রাস্তাগুলো ইট দিয়ে করা, তাই সাইকেল নিয়ে আমার মতো আনাড়ি চালকের খুব অসুবিধাই লাগছিলো। সেন্ট্রাল পেরিয়ে বাসের রাস্তা ধরে কিছুদুর যাওয়ার পর নেমে গেলাম। ৪/৫ মিটার দুরেই কবরস্থান, আমার সবচেয়ে বেশি ভয়ের জায়গা । কয়েকমিনিট কাঁদলাম তারপর চোখ বন্ধ করে শরীরের সব শক্তি দিয়ে প্যাডেল চেপে ছুটে চললাম আলোর পথে। হোটেল পর্যন্ত ২৫ মিনিটের সেই যাত্রাটা ছিলো আমার জীবনের সবচে দীর্ঘতম যাত্রাপথ।…
চলবে…
অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন। দেশে তিনি একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র নিউজরুম এডিটর ও নিউজ কাস্টার হিসেবে কাজ করতেন।