সুইডেন থেকে অনন্য নন্দিতা, পর্ব- ৫
সুইডেনে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে দুশ্চিন্তা লেগেই ছিলো

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৭:৩৮

অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন।
আমাকে কাজ শেখানোর জন্য একজন বন্ধুসুলভ সহকর্মি ছিলেন সেদিন কর্মক্ষেত্রে । তাকে খুলে বললাম সব কথা। তাঁর পরামর্শে শুনে, কানে হেডফোন গুজে ফুল ভলিউমে গান ছেড়েই প্রতিরাতে পাড় হতাম ওই ভয়ংকর পথট। যাই হোক আমাকে সব কাজ বুঝিয়ে দিতে ওঁর বেশি সময় লাগেনি। ‘হারাম’ মাংস বেক করা ছাড়া বাকি কাজতো সংসারে করেই থাকি। ১৫ লিটারের কফি মেকার উঁচু করে কিচেন থেকে রেস্তোরায় নিয়ে যাওয়া ৫ফুটের একজন বাঙালি মেয়ে হিসেবে আমার জন্য বেশ কষ্টেরই ছিলো। তার উপর উইকএ্যান্ডে প্রচুর গেস্ট। ডিশ কালেকশন করতে করতে হাতটা ভেঙে আসতো ।
ব্রেকফাস্ট শেষে সব ডিশওয়াশিং মেশিনে ধুয়ে, নির্ধারিত স্থানে রেখে, কিচেন ফ্লোর ক্লিন করে তবেই ফিরতে পারতাম বাড়ি। ততক্ষণে বেজে যেতো দুপুর ১টা/২টা । আর ওয়ার্কিং ডেতে ১২ টা পর্যন্ত কাজ করে ৩ ঘন্টার ল্যাংগুয়েজ ক্লাস শেষে মিলতো বিশ্রাম। আমার মেয়েরা নিজেরাই খাবার রেডি করে, বাসে করে চলে যেতো স্কুলে।একটাই আরাম যে স্কুলে খাবার দিয়ে হয়না এখানে।ওয়ার্ক পারমিট অ্যাপ্লিকেশনের প্রসেসিং চলছিলো। তাই সেই চিন্তাও লেগে থাকতো।দেড় মাস পর একটা পজিটিভ ডিসিশন এলো, নিশ্চিত হলো অস্থায়ি বসবাস। সুইডিশ মাইগ্রেশন বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী টানা চার বছর একই ধরনের পেশায় কাজ করার পরই স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করা যাবে। তবে পূরণ করতে হবে আরো সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী।
৩ বছর ধরে অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছিলাম স্থায়ী বসবাসের আশায়। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায়, আমার স্বপ্নের পথে হানা দিলো। হোটেল ব্যবসায় ভাটা পড়ায় কর্মি ছাঁটাইয়ের তালিকায় জুড়ে গেলো আমার নামও। কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলো “last in , first out” সুইডেনের এই নিয়মে আগামী দুই মাস পর থেকে আমার চাকরিটা আর থাকছেনা । সেইদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরার পথে করোনা আক্রান্ত আমি । দুইদিন পর থেকেই প্রচন্ড জ্বর আর লাং এ ইনফেকশন। কোভিড থেকে তো বেঁচে গিয়েছিলাম, তবে চাকরীটা বাঁচাতে পারিনি।
সুইডেনে আমার জীবন যেনো আবার শুন্যে এসে ঠেকলো। প্রচন্ড জ্বরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চাকরির আবেদন, আর করেনার কারনে মাইগ্রেশনের নিয়মে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসলো কিনা তাই খুঁজে ফিরতাম মাইগ্রেশন পেইজে। চাকরি যাওয়ার দিন থেকে হাতে সময় মাত্র তিন মাস, এরমধ্যে নতুন কোনো কন্ট্রাকচুয়াল চাকরী না মিললে, ফিরতে হবে দেশে।
কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর, পুরোনো চাকরিতে যোগ দিলাম নোটিফিকেশন পিরিয়ড শেষ করার জন্য। আরো একমাসেরও কম সময় বাকী আছে চাকরির শেষ দিনের। তখনও আমি বস আর শ্রমিক ইউনিয়নকে ধরে চাকরিটা বাঁচানোর সর্বাত্বক চেষ্টা করে যাচ্ছি । আমার সংগ্রামি মহিলা বস এতোদিন পর হঠাৎ করেই চোখ উল্টে দিলো। আমার অবস্থা তিনি বোঝেন তবে আইন অনুযায়ী আমার চাকরি থাকছেনা সেটাই নিশ্চিত করলেন ।যদিও ভুল করে আরো ৬ মাস আগেই ওনি আমি চাকরীটা খেতে বসেছিলেন । তখন শ্রমিক ইউনিয়নের সহযোগিতায় আমাকে চাকরিতে বহাল রাখতে বাধ্য হন তিনি।
১২ ই জানুয়ারি ২০২১, সেদিন আশাহত হয়ে বসের রুম থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হলাম।ঠিক তখনই অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে আমার ফোনে এসএমএস এলো। পৌরসভার এসএমএস।
স্কুল বিভাগে যে চাকরির আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলাম তার ইন্টারভিউ পরের সপ্তাহে ।মনে একটু সাহস পেলাম।হোটেলে আমার চাকরী না থাকলেও, একটা সহযোগিতা ওরা আমাকে করেছিলো।সেটা অবশ্য আইনের মধ্যেই পড়ে। একজন ইমিগ্রেশন উকিল ঠিক করে দিয়েছিলো পরামর্শের জন্য। যার কাছ থেকে আমি জেনেছিলাম- সুইডেনে একই জব কোডের অধীনে অনেক চাকরী থাকে।এটাকে বলা হয় SSYK কোড, আমার বর্তমান চাকরির কোডের সাথে মিলে, এমন প্রফেশনগুলোর তালিকা পেয়ে গেলাম তার সহযোগিতায়।
পরের সপ্তাহে আরো ৭/৮ জনের সাথে, এক সাথে ইন্টারভিউ এর মুখোমুখি হলাম, সুইডিশ ভাষায়। তারপর পার্সোনাল ইন্টারভিউ বসের সাথে । সেখানেও নারী বস। বললেন আমার সিভি দেখে তিনি ইমপ্রেসড। ভাঙা সুইডিশে সিভি তৈরি করেছিলাম, তবে কামলা সিভি নয় প্রফেশনাল। উনি বললেন, “তোমার তো অনেক ভালো এডুকেশনাল এ্যান্ড প্রফেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড, বাচ্চাদের সাথে কাজ করতে চাচ্ছ কেনো?” আমি আমার অবস্থা খুলে বললাম । ওনি আরো অবাক হলেন যখন আমি বললাম — বাচ্চাদের সাথে নয়, আমি বাচ্চাদের স্কুলের কিচেনে কাজ করতে চাই।কারন এটা মাইগ্রেশন বিভাগের চাহিদা।এমন একটি নির্ধারিত বেতনের চাকরি আরো দেড় বছর চালিয়ে যেতে পারলেই আমি স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করবো। আবেদনের পর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে কিচেনেই কাজ করে যেতে হবে । জানিনা হয়তো সৃষ্টিকর্তাই আমার কঠিন পথে সহযোগিতা করার জন্য উনাকে বিশেষ নিয়োগ দিয়েছিলেন। উনি রাজি হয়ে গেলেন।বললেন, আমি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে জানাচ্ছি…
চলবে…
অনন্য নন্দিতা স্থায়ীভাবে সুইডেনে বাস করেন। দেশে তিনি একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র নিউজরুম এডিটর ও নিউজ কাস্টার হিসেবে কাজ করতেন।