
বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের মূল গন্তব্য হিসেবে সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনাময় অঞ্চল হয়ে উঠছে। ব্যবসা, নির্মাণ, কৃষি, টেক্সটাইল এবং পরিষেবা খাতে বাংলাদেশিরা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশ
সরকার এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার
প্রায় ৩০টি দেশে বর্তমানে ৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, এবং এই সংখ্যা ধীরে
ধীরে বাড়ছে। আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের শ্রম এবং বিনিয়োগ আফ্রিকার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে,
পাশাপাশি বাংলাদেশেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশিরা
কোন কোন খাতে অবদান রাখছেন?
আফ্রিকার
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা বহুমুখী খাতে কাজ করছেন। এর মধ্যে কিছু প্রধান খাত হলো:
১.
নির্মাণ খাত
বাংলাদেশি
শ্রমিকরা লিবিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে বড় নির্মাণ
প্রকল্পে কাজ করছেন। আফ্রিকার নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভূমিকা
দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২.
টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প
বাংলাদেশের
অন্যতম প্রধান শিল্প গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল। বর্তমানে কেনিয়া, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া
ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন করেছেন
এবং সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ইথিওপিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীদের
জন্য একটি নতুন হাব হয়ে উঠছে।
৩.
কৃষি ও ফিশারিজ
বাংলাদেশি
উদ্যোক্তারা ঘানা, মোজাম্বিক, উগান্ডা ও কেনিয়ায় কৃষি এবং ফিশারিজ শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন।
আফ্রিকায় কৃষিজমি সস্তা হওয়ায় অনেক বাংলাদেশি কৃষি ব্যবসায় নেমেছেন এবং স্থানীয় কৃষি
অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
৪.
পরিষেবা খাত
আফ্রিকার
বড় শহরগুলোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান এবং ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায় অনেক বাংলাদেশি
জড়িত। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া এবং কেনিয়ায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সংখ্যাও
বাড়ছে।
৫.
স্বল্প ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যবসা
বাংলাদেশি
অভিবাসীরা আফ্রিকায় ফার্নিচার, মোবাইল ফোন এক্সেসরিজ, ওষুধ, কসমেটিকস এবং ইলেকট্রনিক
পণ্য আমদানি ও বিতরণ করছেন। এই খাতগুলোতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অবদান বাড়ছে।
বাংলাদেশি
অভিবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ
আফ্রিকায়
কর্মরত বাংলাদেশিরা বছরে আনুমানিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বাংলাদেশে
পাঠান। যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের তুলনায় এটি কম, তবে ক্রমবর্ধমান হারে বাংলাদেশিরা
আফ্রিকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন।
বাংলাদেশ
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকা, লিবিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও কেনিয়া থেকে রেমিট্যান্সের
প্রবাহ সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ-আফ্রিকা
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশ
ও আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন গভীর হচ্ছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
বাংলাদেশি
শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান
আফ্রিকার
দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের ফলে বিদেশি শ্রমিকদের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশি
কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশি
বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বাজার
আফ্রিকা
একটি বড় কনজ্যুমার মার্কেট। বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো যদি আফ্রিকায় উৎপাদন ও রফতানি বাড়ায়,
তাহলে তারা একটি নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
দ্বিপাক্ষিক
বাণিজ্য বৃদ্ধি
২০২৩
সালে বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার
ছিল।
বাংলাদেশ
আফ্রিকায় পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি রপ্তানি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশিদের
জন্য চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
১.
অভিবাসন ও বৈধ কাগজপত্রের সংকট
অনেক
বাংলাদেশি আফ্রিকায় অবৈধভাবে প্রবেশ করেন, যার ফলে তারা আইনি সমস্যায় পড়েন। বাংলাদেশ
সরকারের উচিত সঠিক ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নিশ্চিত করা।
২.
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা
আফ্রিকার
কিছু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকট রয়েছে। বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তার
জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
৩.
বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন
বাংলাদেশি
ব্যবসায়ীদের জন্য আফ্রিকায় সহজ বিনিয়োগ নীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-আফ্রিকা যৌথ চুক্তি
ও বাণিজ্য সমঝোতা দরকার।
আফ্রিকার
অর্থনীতিতে বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং এটি ক্রমশ আরও প্রসারিত
হচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে বাংলাদেশ-আফ্রিকা
সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই সম্পর্ক
আগামী দিনে আরও গভীর হবে এবং উভয় অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে।
মাইগ্রেশান
কনসার্ন রিপোর্ট