
বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব ছাত্রছাত্রীরা পড়তে যান, তাদের বেশির ভাগের পড়াশোনা-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বাইরে আর তেমন কিছু মাথায় থাকে না। যে দেশটিতে পড়তে যাচ্ছেন, সেই দেশে কীভাবে চাকরি করে বাড়তি আয় ইনকাম করা যায়, কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি দেশটিতে কীভাবে দ্রুত নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া যায়, সেই পরিকল্পনা অনেকেরই থাকে না।
আসলে বিদেশে পড়াশোনা মানে সেই দেশটির মানুষের মতো করে নিজেকে তৈরি করে নেয়া। জানা-বোঝা এবং সেই দেশের মানুষের জীবনাচারের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া প্রয়োজন। তা না হলে পিছিয়ে যেতে হয়, পড়তে হয় নানান বিড়ম্বনায়।
দেশের বাইরে লম্বা সময় থাকতে গিয়ে দেখেছি, বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গেছেন অথচ ড্রাইভিং শিখে জাননি বা ড্রাইভিং লাইসেন্সও নাই। ফলে তাদের পদে পদে পড়তে হয়েছে হেনস্তার মধ্যে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ঘটনা বলি…
জুলাইয়ের এক বিকেল। তীব্র শীত নেমেছে। সাথে দমকা বাতাস। বসে আছি ম্যাকডোনাল্ডসের পার্কিং লটে। গাড়ির ভেতর। খাবারের অর্ডার দিয়েছি। অপেক্ষা করছি কখন প্যাকেট হাতে আসবে। তখন দেখি বাংলাদেশি একটি ছেলে, যিনি কিনা মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি উবারে কাজ করেন। কিন্তু গাড়ি না থাকার কারণে তাকে সাইকেলে করে, ঠান্ডা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে কাজ করতে হচ্ছে। জানতে চাইলাম, বাংলাদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স কেন আনলেন না? জানালেন, লাইসেন্সের এ্যাপ্লাই করেছিলেন বহু আগে কিন্তু মেলবোর্নে আসার আগে তা হাতে পাননি। কবে পাবেন তাও জানেন না।
আরেক শিক্ষার্থী একটি পার্টটাইম চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরছেন কিন্তু ড্রাইভিং না জানা বা গাড়ি না থাকার কারণে চাকরি হচ্ছে না। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা দক্ষ বা যোগ্য হওয়ার পরও ছোটখাটো পার্টটাইম চাকরিগুলো পাচ্ছেন না বা পেলেও বাস-ট্রেইনে চড়ে দূর দূরান্তে গিয়ে চাকরি করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে উঠে না।
অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগেরই লক্ষ্য থাকে, পড়াশোনার পাশাপাশি সুবিধাজনক সময়ে সহজ কাজ কিন্তু বেশি অর্থ উপার্জন করা। তাই অনেকের পছন্দ কোলস্ বা উলওয়ার্থসের মতো বড় সব চেইন শপে কাজ করা। এসব শপ খোলা থাকে বছরের প্রায় সব দিন। সকাল ৬টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। কাজের সুযোগও অবারিত।
ফলে এসব স্টোরের নিয়োগ কর্তারা ভোর ৫টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যে কোনো একটি শিফটে শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ দিতে চান। বাড়ির কাছে কোনো স্টোরে নয়, সাধারণত দূর-দূরান্তে যে কোনো স্টোরে; যেখানে যে সময় লোকের প্রয়োজন, সেখানেই তাদের পাঠাতে চান। কিন্তু যখনই শিক্ষার্থীদের গাড়ি থাকে না, তখনই বাধে বিপত্তি। অনেক সময় নিয়োগ কর্তারা প্রথমেই জানতে চান গাড়ি আছে কিনা বা গাড়ি চালাতে জানেন কিনা? গাড়ি চালাতে না জানলে, গাড়ি না থাকলে, চাকরির আলোচনা সেখানেই স্টপ!
কারণ অনেক সময় ভোর রাত ৫টা থেকে কাজ শুরু করতে হয় কিংবা গভীর রাতে কাজ শেষ করতে হয়। সেই সময়টায় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলে না বা বন্ধ হয়ে যায়। সাথে থাকে ঝড়-বৃষ্টির মতো বিপদের উৎপাত। ফলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, সময় মতো কাজ শুরু করা বা শেষ করা কোনোটাই হয়ে ওঠে না।
বিপরীতে আমাদের পাশের দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ নানান দেশের শিক্ষার্থীরা শুধু ড্রাইভিং জানা বা নিজের গাড়ি থাকার কারণে এসব কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। নিজেদের পড়াশোনার খরচ নিজেরাই বহন করতে পারে এসব কাজ করে।
দেশেই ড্রাইভিং শিখুন, লাইসেন্স হাতে নিন
বিদেশে ড্রাইভিং শেখা, মূল লাইসেন্স হাতে পাওয়া ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। যেমন অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত মূল লাইসেন্স হাতে পেতে তিন-চার বছর সময় লেগে যায়। মূল লাইসেন্স না থাকলে, ড্রাইভিংয়ে দক্ষতা না থাকলে, উবারসহ অন্য কিছু কাজের পারমিট পাওয়া কঠিন। তাই বিদেশ যাবার পরিকল্পনা থাকলে দেশেই ড্রাইভিং শেখা ও দেশি মূল লাইসেন্স দুই-তিন বছর আগেই হাতে রাখা প্রয়োজন।
বিদেশে ড্রাইভিং শেখা
অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা অনেক দেশেই ড্রাইভিং টেস্ট জটিল, সময়সাধ্য, ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ওপর আস্থা না থাকার কারণে অনেক দেশের কর্তৃপক্ষ এ লাইসেন্স দিয়ে কেবল ছয় মাস গাড়ি চালানোর সুযোগ দিয়ে থাকে। নির্দেশনা থাকে ছয় মাস পর যেন নির্ধারিত পরীক্ষা দিয়ে বসবাসকারী দেশটির লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। অনেক সময় দেশি লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর পেরুলে, আর ড্রাইভিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সরাসরি মূল লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়।
অন্যদিকে, বিদেশে ড্রাইভিং শেখা শুরু করতে গেলে, লার্নার্স কোর্স, প্রবেশনারি পিরিয়ড সম্পন্ন করে মূল লাইসেন্স হাতে পেতে তিন কী চার বছর সময় লেগে যায়। আর ড্রাইভিং ভীতি পেয়ে বসলে সময় আরো বেশি লেগে যায়। প্রবেশনারি লাইসেন্স দিয়ে উবারের মতো কাজও করা যায় না।
তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে দেশেই ভালো করে ড্রাইভিং শিখে নেয়া, বিদেশ যাবার দু্ই-তিন বছর আগেই দেশি লাইসেন্স হাতে রাখা। মনে রাখতে হবে আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স, পরে প্রবাস যাত্রা। আর ড্রাইভিং জানা, লাইসেন্স থাকা মাস্ট!